দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) জানিয়েছে, টিকার সুরক্ষা অকার্যকর করার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি মনে করে, এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় টিকাই একমাত্র সমাধান।
রোববার (২ আগস্ট) আইসিডিডিআর,বি থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত টিকাদানের বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরাই এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামে সন্দেহভাজন ৭২১ জন এবং নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ৯৫ জনের।
এই প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা গত ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সি ৩৪১ জন সন্দেহভাজন শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। এর মধ্যে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত পাওয়া গেছে তিন থেকে আট মাস বয়সি শিশুদের মাঝে; সন্দেহভাজন ১৪১ জনের মধ্যে ১৩৭ জনেরই হাম শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, টিকার বয়স না হওয়া ৯ মাসের কম শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া যাদের টিকার বয়স হলেও টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের মধ্যে আক্রান্তের হার প্রতি শতকে ৯৭ জন। এক ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমিতের হার ৯২ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা নেওয়াদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৭৬ শতাংশ। গবেষকেরা জানান, টিকার সুরক্ষা না থাকা শিশুদের তুলনায় দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের আক্রান্তের হার কমে ৭৬ শতাংশে নেমেছে, যা টিকার কার্যকারিতার ধারণার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, "আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে দুই ডোজ টিকা পাওয়া কিছু শিশুর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।"
তিনি আরও জানান, ভাইরাসগুলোর জিনগত বিন্যাস বুঝতে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সের ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দেশে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ‘বি৩’ (B3) জিনোটাইপ বা সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে মিল রয়েছে। ভাইরাসের এইচ (H) প্রোটিনে কিছু মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত হলেও প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানান গবেষকেরা।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তবে তিনি মনে করেন, টিকাদানের হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও প্রাদুর্ভাব কেন এত বড় হলো, তা বোঝা জরুরি।
বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে দেওয়া হয়। ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরা মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল থাকে। তবে ১৬ জন মা ও শিশুর নমুনার ওপর চালানো আগের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। ফলে ৩ থেকে ৮ মাস বয়সে শিশুদের দেহে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ জানান, টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হচ্ছে, অপুষ্টির প্রভাব এবং মায়েরা কখন অ্যান্টিবডি হারাচ্ছে—এসব বিষয়ে দেশের চারটি প্রধান বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্টসহ আরও বিস্তৃত গবেষণা শুরু হয়েছে।
গবেষকেরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাব বা আশঙ্কার কথা ভেবে টিকা দিতে দেরি করা বা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। শিশুবয়সে সঠিক সময়ে হাম-রুবেলা টিকার সবকটি ডোজ নিশ্চিত করার জন্য জোর দেওয়া হয়েছে।