ম্যাচ শেষ। দল জিতুক বা হারুক—এরপরই অপেক্ষা কোচের সংবাদ সম্মেলনের। সেখানে সাধারণত পাওয়া যায় ম্যাচের ব্যাখ্যা, আবেগের রেশ কিংবা কখনও ক্ষোভের ইঙ্গিত। তবে মাইক্রোফোনের সামনে যদি বারবার একই পুরোনো ক্লিশেই ফিরে আসে বক্তব্য, সেটি কেমন অভিজ্ঞতা হয়—সেটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

এই চিত্র নতুন নয়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও বিশ্বসেরা কোচদের মধ্যে কেউ কেউ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বারবার ভর করেছেন পরিচিত ক্লিশে আর নিরাপদ বাক্যাংশে; আবার কেউ কেউ উল্টোভাবে—মনে যা ছিল, তা-ই বলেছেন অকপটে।

বিশ্বকাপজুড়ে কোচদের সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এআইভিত্তিক একটি ট্র্যাকার। সেখানে উঠে এসেছে সংবাদ সম্মেলনে কারা ছিলেন বিরক্তিকর, কারা ছিলেন খোলামেলা। রিপোর্ট অনুযায়ী, বাঁধাধরা বাক্যের ব্যবহারের ধরন পরিমাপ করতে বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ‘সিঞ্চ’ অভিনব এই উদ্যোগটি নেয়। ফুটবলের জনপ্রিয় পরিসংখ্যান ‘এক্সজি’র (এক্সপেক্টেড গোল) আদলে তারা তৈরি করে ‘এক্সসি’ বা এক্সপেক্টেড ক্লিশে ট্র্যাকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত এই সিস্টেমে ২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৬ জন প্রধান কোচের ৩৯৪টি সংবাদ সম্মেলন বিশ্লেষণ করে মোট ১৪,২৭০টি ক্লিশে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, বিশ্বসেরা কোচদের অনেকেই সোজাসুজি উত্তর দিতে রাজি নন; প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে তাঁরা নিয়মিত আশ্রয় নিয়েছেন পরিচিত ও নিরাপদ কিছু বুলি বা প্লাটিটিউডের।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলা বা সবচেয়ে বেশি ক্লিশে ব্যবহার করা কোচদের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার টনি পপোভিচ। তিনি প্রতি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে ৫৯.৫টি ক্লিশে ব্যবহার করেছেন (৮টি সংবাদ সম্মেলনে মোট ৪৭৬টি এক্সসি)। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে প্যারাগুয়ের গুস্তাভো আলফারো (গড়ে ৫৮.৮) এবং তৃতীয় স্থানে কেপ ভার্দের বুবিয়েস্তা (গড়ে ৫৫.৩)।

অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের হেভিওয়েট কোচ টমাস টুখেলকে এই তালিকায় বাজে পারফরম্যান্সের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রতি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে ৫০.৮টি ক্লিশে ব্যবহার করে তিনি টুর্নামেন্টের চতুর্থ সর্বনিম্ন বা বাজে ‘কমিউনিকেটর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ম্যাচ-পূর্ব ও ম্যাচ-পরবর্তী মিলিয়ে ১৬টি সংবাদ সম্মেলনে তিনি রেকর্ড ৮১৩টি ক্লিশে ছুড়েছেন, যা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ একক সংখ্যা।

অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা কোচের সিদ্ধান্তের পরিষ্কার ব্যাখ্যা খোঁজেন। কিন্তু আলোচিত জবাবগুলোর ধরন ছিল—‘আমরা যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি সেটিতেই মন দিচ্ছি’ কিংবা ‘এটি সব সময় দলগত প্রচেষ্টা’—জাতীয় কথাগুলোই বারবার ঘুরে এসেছে কোচদের মুখে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর টুখেলের এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে সমালোচনাও করেছিল ব্রিটিশ মিডিয়া।

বিশ্বকাপের কোচদের মধ্যে আগে থেকেই খোলামেলা কথা বলার জন্য পরিচিত মার্সেলো বিয়েলসা। এআই ট্র্যাকারেও উঠে এসেছে একই তথ্য। সবচেয়ে কম ক্লিশে ব্যবহার করে পুরো টুর্নামেন্টের সেরা ও সোজাসাপটা বক্তা হিসেবে নজর কেড়েছেন উরুগুয়ের এই কোচ।

তবে বিয়েলসা খুব বেশি কথা বলার সুযোগ পাননি। তাঁর দল গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ খেলেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। মোট ৬টি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে মাত্র ৬টি ক্লিশে ব্যবহার করেছেন বিয়েলসা। কম ক্লিশের দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকা দুজনই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছেন—কুরাসাওয়ের ডিক অ্যাডভোকাট (গড়ে ১৫.৩) এবং উজবেকিস্তানের ফ্যাবিও ক্যানাভারো (গড়ে ১৯.৫)।

টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলা দুই দলের কোচকে মোট ৮টি ম্যাচের সংবাদ সম্মেলন সামাল দিতে হয়েছে। এর মধ্যে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘ক্ল্যাশ-হেভি’ বা বাঁধাধরা বুলি বলা কোচ। ৪৪.৬ গড় এক্সসি নিয়ে তিনি র‍্যাংকিংয়ের ১১ নম্বরে অবস্থান করছেন (১৬টি সংবাদ সম্মেলনে মোট ৭১৪টি ক্লিশে)। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরও তাঁর মুখে ছিল সেই চেনা কথা—‘আমরা বিশ্বের সেরা দল এবং তা প্রমাণ করেছি’, ‘এই দল ছাড়া এটি অসম্ভব ছিল’।

অন্যদিকে রানার্সআপ আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি হেরে যাওয়ার পরও ছিলেন যথেষ্ট সংযত ও পরিমিত। তিনি সংবাদ সম্মেলনে গড়ে ৩০.৯টি ক্লিশে ব্যবহার করে র‍্যাংকিংয়ের ২৭ নম্বরে রয়েছেন—যা দে লা ফুয়েন্তের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক ও স্পষ্টভাষী বলে বিবেচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, টুর্নামেন্টের নকআউট বা সেমিফাইনালের মতো জায়গায় চাপ বাড়লে কোচদের ক্লিশে ব্যবহারের হার ৯ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতার তেজ যত বাড়তে থাকে, কোচরা ততই নিজেদের ভুল বা কৌশল খোলাসা না করে নিরাপদ বাক্যাংশের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করেন—এমন ইঙ্গিতই উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

এআই ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে কোচেরা কয়েকটি বাক্য বারবার আওড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে ‘আমরা প্রতিটি প্রতিপক্ষকে সম্মান করি’। এই কথাটি ৯ জন কোচ মোট ১৫ বার বলেছেন।

‘আমরা কেবল আমাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোতে নজর দিচ্ছি’—এই কথাটি ৯ জন কোচ বলেছেন ১১ বার।

এ ছাড়া বেশি বলা হয়েছে ‘আমরা আমাদের নিজেদের শক্তি ও গুণাবলি জানি’ (৬ কোচ, ৯ বার), ‘আমাদের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে’ (৫ কোচ, ৭ বার), ও ‘পুরো দেশ আমাদের পাশে আছে’ (৫ কোচ, ৭ বার)।

ক্যাটাগরি হিসেবে বিচার করলে কোচরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন ‘বিনয় বা হিউমিলিটি’ (৩৮২ বার), মাইন্ডসেট (৩৫৩ বার), ক্যারেক্টার (২৭০ বার), ন্যারেটিভ (১৫১ বার), অ্যাপ্রোচ (১৪২ বার) ও ট্যাটটিকস (১৩২ বার)।

সিঞ্চ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট জার্স্টম্যানের মতে, ‘আন্তর্জাতিক ফুটবল কোচদের চাপ ভিন্নধর্মী হলেও যোগাযোগের সংকটটা সর্বত্র একই। রাজনৈতিক নেতা বা বৈশ্বিক ব্যবসার সিইও—সবাই চাপের মুখে নিজেদের বাঁচাতে এমন পরিচিত ও নিরাপদ শব্দ চয়ন করেন, যা সহজে খণ্ডন করা যায় না। তবে ফলাফল যা-ই হোক, যে কোচরা নিজেদের সিদ্ধান্তগুলো সততার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন, ভক্তদের চোখে তাঁরাই দিন শেষে আলাদা হয়ে থাকেন।’

বিশ্বকাপে একটা মিনিটও খেলার সুযোগ পাননি যে দুর্ভাগারা