১৯৫৯ সালের শুরু। তখন আমার বয়স সাড়ে এগারো, আর পিঠোপিঠি ভাই মোমেনের দশ। বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে আমরা তখন সবে সামনের মাঠে ফুটবল খেলি, পাশের ধোপাপাড়া আর মিস্ত্রি-দোকানদারদের ছেলেদের সঙ্গে। ক্রিকেট সম্পর্কে তেমন জানা ছিল না, আগ্রহও জাগেনি তখন।
ঠিক এই সময় খবর এল—ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট দল পাকিস্তান সফরে আসছে এবং তিনটি টেস্ট খেলবে। ক্রিকেট মানে তখন দিনব্যাপী পাঁচ দিনের টেস্ট ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যেত না। বাসায় খবরের কাগজ আসত তিনটি—পাকিস্তান অবজারভার, ইত্তেফাক এবং কলকাতার স্টেটসম্যান। খেলার পাতায় অবজারভার ও ইত্তেফাক-এ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদও পাওয়া যেত। স্টেটসম্যান অবশ্য চাটগাঁ আসত এক দিন পর, সেখানেও এই খবরটা দাগ কাটত। ধীরে ধীরে আমরা আগ্রহী হয়ে উঠলাম।
সেসময়কার ক্রিকেট দুনিয়ায় অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দুই পরাশক্তি হিসেবেই দেখা হতো। তাই তাদের মহারণ ঘিরে আগুনের মতো উত্তাপ ছড়াত। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ১৯৫৭-৫৮ সালেই পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে নানা নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। প্রথম টেস্টেই ফলোঅনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান গড়ল ৬৫৭/৮, আর হানিফ মোহাম্মদের সংগ্রহ দাঁড়াল ৩৩৭—যা কিংবদন্তি ব্র্যাডম্যানের ৩৩৪কেও ছাড়িয়ে গেছে। ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড়—কে এই হানিফ মোহাম্মদ? এমন প্রশ্ন স্বয়ং ব্র্যাডম্যানও তুলেছিলেন; তিনি নিশ্চয়ই ভাবতেন, বিশাল শরীরের কোনো এক অতিমানব হবে হয়তো। পরে যদিও ছোটখাটো হানিফই পাকিস্তানের প্রথম তারকা ব্যাটার হয়ে ওঠেন।
পাকিস্তান তখনো দুধের শিশু—দুর্দান্ত ক্রিকেটশক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারলেও পাকিস্তান শৈশবেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে। এর আগে ১৯৫৪ সালে এ এইচ কারদারের নেতৃত্বে তারা ইংল্যান্ড সফরে এসেছিল। ইংল্যান্ডে ভারত নিয়মিত ৫-০ সিরিজ হারে—সেখানে পাকিস্তান ১-১ ড্র করে আসে। ওভাল টেস্টে ফাস্ট বোলার ফজল মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিংও জয় এনে দেয়। তবে হানিফের সেই কীর্তিটাও তখন বিশ্বরেকর্ড ছিল না—টেস্ট ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ছিল ইংল্যান্ডের লেন হাটনের ৩৬৪ রান। দীর্ঘদিনের সেই রেকর্ডও শেষ পর্যন্ত ভাঙে এই সিরিজেই। তৃতীয় টেস্টে গারফিল্ড সোবার্স নামের এক তরুণ খেলোয়াড় অপরাজিত করেন ৩৬৫; ব্রায়ান লারা ছাড়িয়ে না যাওয়া পর্যন্ত এটিও টিকে ছিল বহু কাল।
এই তথ্যগুলো জেনে আমরা অপেক্ষার দিন গুনতে শুরু করলাম। পাকিস্তানের সমর্থন ছিল স্বাভাবিকভাবেই, তবে দারুণ লড়াইয়ের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তান দলে প্রিয় খেলোয়াড়ও ছিল অনেক। অধিনায়ক ফজল মাহমুদ সিনেমার নায়কের মতো দেখতে, ক্রিকেট বিশ্বেও তিনি অন্যতম সেরা মিডিয়াম-ফাস্ট বোলার। হানিফ মোহাম্মদ, সাইদ আহমেদ, ইমতিয়াজ, ওয়ালিস ম্যাথিয়াস, ইজাজ বাট, আলিমুদ্দিন, সুজাউদ্দিন—এই ব্যাটিং লাইনআপ শক্তপোক্ত। আর অধিনায়কের পাশে পেস বোলিংয়ে মাহমুদ হোসেন, অ্যানটাও ডি’সুজা; স্পিনে নাসিমুল গনি ও হাসিব আহসান—মিলে বোলিংশক্তিও ভালোই। তিন টেস্টের সিরিজ—খেলা করাচি, লাহোর ও ঢাকায়।
সেসময় টেলিভিশন ছিল না বললেই চলে; রেডিওর ধারাভাষ্যই ছিল তাৎক্ষণিকভাবে খবর জানার প্রায় একমাত্র পথ। আমাদের বাসায় রেডিও বা ব্যাটারিচালিত ট্রানজিস্টরও ছিল না—কারণ বাবা শব্দের উৎপাতের ঘোর বিরোধী। ফুটবল খেলার সাথি ইকবাল খানদের রেস্তোরাঁ খাজা হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা ধারাভাষ্য শুনতাম। ইকবালেরই দুই পুত্র তামিম ইকবাল আর নাফিস ইকবাল অনেক পরে বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনের প্রখ্যাত মুখ হয়ে ওঠেন। ইংরেজি ধারাভাষ্য ঠিক কতটা বুঝতাম জানা নেই, তবে ওমর কোরেশী এবং জামশেদ মার্কারের ইংরেজি কমেন্ট্রি আমাদের কাছে দারুণ লাগত।
তখন ক’টা দেশই–বা টেস্ট ক্রিকেট খেলে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড এ-ই তো! এর মধ্যে গারফিল্ড সোবার্স আমাদের নজরে ক্রমে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলেন। দুর্দান্ত ব্যাটিং, পেস-স্পিন দুই ধরনেই বল করতে পারা আর নজরকাড়া ফিল্ডিং দিয়ে তিনি যেন হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের সব্যসাচী দেবতা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে গ্যারি সোবার্স ছাড়াও রোহান কানহাই, কনরাড হান্ট—তারকা ব্যাটারদের সঙ্গে ছিলেন কোলি স্মিথ, বেসিল বুচার, জো সলোমন প্রমুখ। ভয়ংকর ফাস্ট বোলার ওয়েসলি হলের পাশাপাশি ছিলেন বিশ্বসেরা স্পিনার ল্যান্স গিব্স। পাকিস্তান প্রথম দুই টেস্টেই জেতে। সোবার্স-কানহাইয়ের পারফরম্যান্স মোটামুটি ব্যর্থ থাকে। লাহোরের শেষ টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৫৬ রানে জিতে কিছুটা মান রাখে। কানহাইয়ের ২১৭ ও সোবার্সের ৭২—এসবও উল্লেখ করার মতো। এরপর পরই ১৯৫৯-৬০-এ অস্ট্রেলিয়া আসে পাকিস্তানে। পাকিস্তান শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার কাছে ২-০ হারলেও লড়াই যে ভালোই জমেছিল—সেটাও চোখে পড়ার মতো ছিল। অধিনায়ক রিচি বেনো, ব্যাটার নিল হার্ভে, ও’নিল, ম্যাকডোনাল্ড এবং বোলার লিন্ডওয়াল, ডেভিডসন, মেকিফরাও আমাদের মন জয় করে নেয়।
আমি আর মোমেন এবার ক্রিকেটের খাতা বানালাম। লেটারপ্রেসে হলদেটে নিউজপ্রিন্টে ছাপা খেলোয়াড়দের ঝাপসা ছবি সাঁটলাম, আর ছবির পাশে নিজের হাতের লেখায় খেলোয়াড়দের কীর্তিগাথাও লিখলাম। রেডিও আর খবরের কাগজে টেস্ট ক্রিকেটের যাবতীয় সংবাদ রাখতে শুরু করলাম। তখন ক’টা দেশই–বা টেস্ট ক্রিকেট খেলে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড—এ-ই তো। এর মধ্যে গারফিল্ড সোবার্স আমাদের নজরে ধীরে ধীরে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলেন। দুর্দান্ত ব্যাটিং, পেস-স্পিন দুই ধরনেই বল করতে পারা আর নজরকাড়া ফিল্ডিং—সব মিলিয়ে তিনি যেন হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের সব্যসাচী দেবতা।
এর পর থেকে ক্রিকেটের আঙিনায় সোবার্সের জয়যাত্রার নানান কীর্তি, আর আমাদের ক্রিকেটপ্রেম ক্রমে ঘনীভূত হয়ে তীব্র আসক্তিতে রূপ নেওয়া। সেই স্যার গারফিল্ড সোবার্স প্রয়াত হলেন ৯০ বছর বয়সে, আমার আর মোমেনের ক্রিকেট নিয়ে যাবতীয় উচ্ছ্বাসে বারবার সোনালি মুকুট পরানো সোবার্স, ক্রিকেটীয় শৌর্য আর শালীনতার সর্বোচ্চ প্রতীক গ্যারি সোবার্স।
১৯৬৩-৬৪ সালের দিকে হাতে এল ক্রিকেটবিষয়ক বাংলা বই—পশ্চিমবঙ্গের লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর রমণীয় ক্রিকেট। অনবদ্য সরস বাংলায় লেখা বইটি। খেলা নিয়ে এমন বই আমরা আগে পড়িনি, ক্রিকেট নিয়ে এমন রসালো বয়ান সম্ভব তা-ও ভাবিনি। বইটিতে প্রথম টাই টেস্টের বিবরণ পড়ে আমরা রোমাঞ্চিত। ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে সে টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে করল ৪৫৩, সোবার্স ১৩২। অস্ট্রেলিয়া দাঁড় করাল ৫০৫ রানের কড়া জবাব, নরমান ও’নিল ১৮১। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংসে করল ২৮৪, অস্ট্রেলিয়ার জিততে চাই ২৩৩। ওয়েসলি হলের করা এই টেস্টের শেষ ওভারে অস্ট্রেলিয়া কীভাবে ২৩২ রানে অলআউট হলো আর প্রথম টাই টেস্টের ইতিহাস রচিত হলো—এই উত্তেজনাপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন শঙ্করীপ্রসাদ। পড়তে পড়তে আমাদের লোম খাড়া হয়ে যায়। শঙ্করীপ্রসাদ লিখেছেন সেঞ্চুরির পথে সোবার্স এমন পেটালেন যে কানের পাশ দিয়ে যাওয়া বলে হাত দিতে ভয় পেলেন বোলার।
এর পর থেকে ক্রিকেটের আঙিনায় সোবার্সের জয়যাত্রার নানান কীর্তি, আর আমাদের ক্রিকেটপ্রেম ক্রমে ঘনীভূত হয়ে তীব্র আসক্তিতে রূপ নেওয়া—এই ধারাবাহিকতাই যেন একসময় স্মৃতির শক্ত বুনন হয়ে দাঁড়ায়। সেই স্যার গারফিল্ড সোবার্স প্রয়াত হলেন ৯০ বছর বয়সে—আমার আর মোমেনের ক্রিকেট নিয়ে যাবতীয় উচ্ছ্বাসে বারবার সোনালি মুকুট পরানো সোবার্স, ক্রিকেটীয় শৌর্য আর শালীনতার সর্বোচ্চ প্রতীক গ্যারি সোবার্স। আজকের নানা রঙের ক্রিকেটে বদহজমি রকমের বাড়াবাড়ির মধ্যে সোবার্সের কীর্তি তেমন ঝলমলে না মনে হতে পারে। আবার পরিসংখ্যানও তো বলে—৯৩ টেস্টে ৮ হাজার ৩২ রান আর ২৬ শতক, টেন্ডুলকারের অর্ধেকের মতো। তবে গড় ৫৭.৭৮, আর ওখানেই সোবার্সের জিত। এ ছাড়া পেস ও স্পিন বোলিংয়ের বৈচিত্র্য নিয়েও ২৩৫ উইকেট।
সোবার্সকে বুঝতে হবে ক্রিকেটের ইতিহাস, বিবর্তন আর তাঁর সময়ের ক্রিকেটে যে ধ্রুপদি শিল্পের ছোঁয়া আর সাহিত্যের উপাদান ছিল তার একটি সমন্বিত চৈতন্যবোধের মাধ্যমে, ক্রিকেটীয় নান্দনিকতার ভিন্ন মাত্রায় অবগাহনের মাধ্যমে।
অলরাউন্ডার হিসেবেও জ্যাক ক্যালিস তাঁর ওপরে, তবে ১৩ হাজার ২৮৯ রান আর ২৯২ উইকেটের জন্য তাঁকে খেলতে হয়েছে ১৬৬ টেস্ট—সোবার্সের প্রতিভার পরিচয় এখানেই। সেই ১৯৬৮ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬ বলে ৬ ছক্কা মারা প্রথম ব্যাটার তিনি। তবু পরিসংখ্যানের ডামাডোল দিয়ে সোবার্সের মতো ক্রিকেটশিল্পীকে কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না। আরেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি স্যার লিয়ারি কনস্টেনটাইনের যেন যোগ্য উত্তরসূরি তিনি—যাঁদেরকে পরিসংখ্যানের ক্ষুদ্র মাপকাঠিতে মাপা যায় না।
আমরা সোবার্সের খেলা দেখিনি, সামনাসামনিও না, টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারেও না। ১৯৫৯ সালে সোবার্স ঢাকায় খেলে গেলেও এরপরও বহুদিন খেলা সরাসরি দেখা সম্ভব, তা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। এখন বরং পুরোনো অনেক ভিডিও-কাটিং দেখার সুযোগ হয়েছে, তবে শুধু একটি ক্যামেরায় তোলা সে সবে মন ভরবে না। সোবার্সকে বুঝতে হবে ক্রিকেটের ইতিহাস, বিবর্তন আর তাঁর সময়ের ক্রিকেটে যে ধ্রুপদি শিল্পের ছোঁয়া আর সাহিত্যের উপাদান ছিল তার একটি সমন্বিত চৈতন্যবোধের মাধ্যমে, ক্রিকেটীয় নান্দনিকতার ভিন্ন মাত্রায় অবগাহনের মাধ্যমে।