রুপালি পর্দায় ববিতার যাত্রা শুরু হয় নিজের ইচ্ছায় নয়। ছোটবেলায় সিনেমায় অভিনয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না তাঁর। পরিবারের অনুরোধেই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। এরপর ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য পথচলা—সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত, রাজ্জাকের সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি, আমজাদ হোসেনসহ খ্যাতিমান নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের আনন্দ-বেদনা মিলিয়ে এক দীর্ঘ অধ্যায়। ‘ক্রাউন সিমেন্ট-অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারে ববিতা শোনান এই দীর্ঘ পথের গল্প।
শৈশবের প্রসঙ্গে বারবার ফিরে আসেন মা-বাবার কথা। বাবা এ এস এম নিজামুদ্দীন আতাইয়ুব সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা জাহানারা সন্তানদের শুধু লেখাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। ববিতা বলেন, ‘আম্মা আমাদের বলতেন, তোমরা যতই লেখাপড়া করো, তোমাদের আলাদা গুণ থাকতে হবে। কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গান—এগুলো জানতে হবে। শুধু লেখাপড়াই সব নয়।’
অন্যদিকে বড় বোন সুচন্দাকে শুটিং করতে দেখেই অভিনয়ের প্রতি অনীহা জন্মেছিল তাঁর। তিনি বলেন, ‘ডিরেক্টর বলছে, খালি পায়ে বালুর মধ্যে দৌড়ান, পাহাড়ে উঠুন, আবার কাট, আবার শট। আমি ভাবতাম, আমার বোনকে এত কষ্ট দিচ্ছে! আমি বলতাম, আমাকে যদি কেউ সিনেমা করতে বলে, কোনো দিন করব না।’
তবে জহির রায়হানের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারেননি ববিতা। প্রথমে সংসার ছবিতে অভিনয় করেন; তখন তাঁর নাম রাখা হয় ‘সুবর্ণা’। পরে উর্দু ছবি জ্বলতে সুরাজ কে নিচের সময় নতুন নাম খোঁজা হয়। এ প্রসঙ্গে ববিতা বলেন, ‘ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরীর স্ত্রী বললেন, আমরা এর নাম দেব ববিতা। তখন কেউ বলেছিলেন, ভারতে একজন ববিতা আছেন। জবাব এসেছিল, তাতে কী? আমাদের দেশে ববিতা।’
বাংলা ছবিতে নায়িকা হিসেবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাত্রা ছিল অবিচল। নায়ক ছিলেন রাজ্জাক। প্রথম রোমান্টিক দৃশ্যের কথা মনে পড়ে ববিতা হাসতে হাসতে বলেন, ‘বলল, রাজ্জাক তোমাকে জড়িয়ে ধরবে। আমি বললাম, ও মা! এ তো কদিন আগে বাবা ডাকলাম। এখন আবার প্রেমের অভিনয় করব? আমি পারব না।’
ববিতার মতে, মুক্তি পাওয়ার দিনটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন। প্রথম পারিশ্রমিক ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি টয়োটা গাড়ি কেনেন তিনি। সেই গাড়ি দেখাতে হাসপাতালে ভর্তি মায়ের কাছে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, মা আর নেই।
অভিনয়ই হয়ে ওঠে জীবনের পথ
দেশীয় চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও ডাক আসে। সত্যজিৎ রায়ই এই সুযোগ এনে দেন—তাঁর অশনি সংকেত ছবির মাধ্যমে। প্রথমে কলকাতা থেকে চিঠি এলেও ববিতা তা বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ফোন এলে তিনি কলকাতায় যান। প্রথম সাক্ষাতের কথা বলতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘আমি অনেক মেকআপ করে গিয়েছিলাম। উনি বললেন, তুমি এত সেজেগুজে এসেছ কেন?’
পরদিন মেকআপ ছাড়া অডিশনে যেতে বলেন সত্যজিৎ রায়। ববিতার ভাষায়, ‘দাদা বললেন, আজকেই তো তোমাকে বেশি সুন্দর লাগছে।’ অডিশন শেষে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়াও মনে রেখেছেন তিনি। ‘তিনি বললেন, “ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি। আমার অনঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি।”’
শুটিংয়ের আগে তাঁকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন সত্যজিৎ রায়। একবার ববিতা লিখেছিলেন, মোটা হওয়ার জন্য তিনি পান্তাভাত খাচ্ছেন। জবাবে পরিচালক লিখেছিলেন, ‘খবরদার, তুই এটা করিস না। তুই যা আছিস, খুব সুন্দর আছিস।’
বাংলাদেশের পরিচালকদের মধ্যে আমজাদ হোসেনের নাম আলাদা করে উল্লেখ করেন ববিতা। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি গ্রামভিত্তিক ছবি এত সুন্দর বানাতেন।’ কথার ফাঁকে উঠে আসে নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, কসাই, সুন্দরী ছবির নাম। গোলাপী এখন ট্রেনের একটি সংলাপও শোনান তিনি—‘কিয়ের ফার্স্ট ক্লাস? আমরা হক্কলেই এক ক্লাসের মানুষ।’
সহশিল্পীদের প্রসঙ্গে প্রথম পছন্দ রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে অনেক ভালো ভালো ছবি করেছি।’ আর রোমান্টিক জুটির প্রসঙ্গ উঠলে ববিতার উত্তর, ‘জাফর ইকবাল। ওর সঙ্গে আমার ছবি অনেক দর্শক খুব পছন্দ করত।’
শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় ২৭৫টি ছবিতে অভিনয় করেছেন ববিতা। প্রযোজনা করেছেন কয়েকটি ছবিও। তবে পরিচালনার কাজে ছিলেন না।
এখন আর নিয়মিত অভিনয় করেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এখন যে ধরনের গল্প আসে, এগুলো আমার মোটেই ভালো লাগে না।’
তবে অভিনয় থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেননি। ববিতার ভাষায়, ‘যদি কোনো সময় ভালো গল্প পাই, ভালো চরিত্র পাই, অবশ্যই করব। আমি মনে করি, একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই।’
সাক্ষাৎকারের শেষেও দর্শকদের কথাই তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমি ববিতা হয়েছি আমার প্রিয় দর্শকবৃন্দের জন্য। আপনারা আমাকে এত ভালোবেসেছেন বলেই আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি।’
পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, আবৃত্তি ও সংস্কৃতিচর্চার যে শিক্ষা মা দিয়েছিলেন, সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছিলেন ববিতা। যে মেয়ে একদিন বলেছিল, ‘আমি কোনো দিন সিনেমা করব না’, সময়ের পরিক্রমায় সেই মেয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অনিবার্য নাম।
আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক