আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে লিওনেল মেসি-হুলিয়ান আলভারেজদের সঙ্গে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার খেলছেন—এমন দৃশ্যই সেখানে নতুন করে নজর কাড়ছে। অনূর্ধ্ব-১৭ দলে আকাশি-নীল জার্সি গায়ে মাঠ মাতাচ্ছেন কিকি রামোস নামের এক তরুণ। আর্জেন্টিনায় বর্ণবাদ নিয়ে নানা রকম ‘অপবাদ’ থাকলেও রামোস জানাচ্ছেন, তিনি এখন পর্যন্ত দেশটিতে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হননি।

রামোসের পরিচয় জানতে হলে ফিরে যেতে হয় পেছনের এক করুণ ঘটনার দিকে। ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি। হাইতির মাটি কেঁপে ওঠে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে। দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই বিপর্যয়ের কেন্দ্র ছিল রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্স থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার এক অনাথ আশ্রমে যারা বেঁচে যান, তাদের মধ্যে ছিলেন ৮-৯ মাস বয়সের স্টেফান রামোস।

ভূমিকম্পের আগেই এক আর্জেন্টাইন পরিবার তাঁকে দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বিপর্যয়ের মধ্যেও কাগজপত্র অক্ষত থাকায় তিনি উদ্ধার-প্রক্রিয়ায় টিকে যান এবং দ্রুতই দক্ষিণ আমেরিকায় পাড়ি জমান। এরপর তাঁর বেড়ে ওঠা অনেকটা সেখানকারই সাধারণ এক তরুণের পথ—৬ বছর বয়সে ভেলেজের নিচের সারির দলে ভর্তি, পরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা।

নিজের খেলার ধরন নিয়েও রামোস জানিয়ে দিয়েছেন—তিনি গতি পছন্দ করেন এবং ড্রিবলিং করতে ভালোবাসেন। জুলাইয়ের শেষ দিকেই এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগতে দেখা যায়। ইকুয়েডরের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচে খেলেন রামোস। প্রথম ম্যাচে বদলি হয়ে নেমে অভিষেক, আর আতালান্তার লেওন কোলবোভস্কি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরানোর একমাত্র গোলটি আসে তাঁর পা থেকে। কাতারের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে দিয়েগো প্লাসেন্তের পরিকল্পনায় নিজের নাম শক্তভাবে লিখিয়ে ফেলল এই তরুণ।

গোল করার পরদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে রামোসকে এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা যায়, যা তাঁর বয়সের কারও কাছে করাই উচিত হয়নি—আর্জেন্টিনা কি বর্ণবাদী দেশ? সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ থেকে ছড়ানো নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি অস্বাভাবিক ছিল না। তবে উত্তরটা আসে অকপট আত্মবিশ্বাসে, ‘যেদিন থেকে আমি আর্জেন্টিনায় আছি, কখনো নিজেকে বৈষম্যের শিকার মনে হয়নি। অন্যদের চেয়ে আলাদাও মনে হয়নি কখনো। যারা আর্জেন্টিনাকে বর্ণবাদী বলে, তারা শুধু বলার জন্যই বলে।’

এই বক্তব্যের পেছনের বাস্তবতাও জানতে হলে দেখতে হয় তাঁর অতীত। রামোস কখনো হাইতিতে ফিরে যাননি। ফেরার কথা ভাবেনওনি, যদিও বড় হয়ে একদিন আগ্রহ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন। তাঁর পরিচয়ের পুরোটাই আজ আর্জেন্টাইন—ভাষা, রাস্তা, ফুটবল মাঠ—সবকিছুই যেন একটাই পরিচয়ের ধারায়।

জাতীয় দলের ডাক পাওয়ার খবরটাও তাঁর কাছে এসেছিল বন্ধুদের বার্তার মধ্য দিয়ে। এরপর ফিটনেস কোচের মেসেজে ‘এএফএ’ শব্দটা দেখে প্রথমে ভুল পড়েছিলেন বলে মনে করেছিলেন—বিশ্বাস না হওয়ায় ক্লাস থামিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলেন বাবা-মাকে জানাতে।

ফুটবলে জাতীয় দলের জার্সি অনেক সময় শুধু প্রতিভার স্বীকৃতি নয়, পরিচয়ের দলিল হিসেবেও দেখা হয়। রামোসের ক্ষেত্রে সেটি আরও বেশি করে স্পষ্ট—হাইতিতে জন্ম নিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপানো প্রথম ফুটবলার তিনি।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে আর্জেন্টিনা আছে ডেনমার্ক, মোজাম্বিক আর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গ্রুপ সি-তে। সেই মঞ্চে জায়গা পাকা করার লড়াইয়ে রামোস আছেন ভালোমতোই।