যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এখন বড় কোনো ঘোষণার ওপর নয়, বরং ওয়াশিংটন কতটা বাস্তব কৌশলগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য বুঝতে পারে, তার ওপর নির্ভর করছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে ইসরায়েলের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার (নরমালাইজেশন) শর্তের সঙ্গে বেঁধে দেয়, তবে তারা দুটি ভিন্ন নীতিগত লক্ষ্যকে জোর করে মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বহুমুখী শক্তির উত্থান ত্বরান্বিত হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

মূল প্রশ্নটি সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া অঞ্চলের জন্য উপকারী কি না তা নয়—কারণ ভবিষ্যতে এটি উপকারী হতে পারে এমন অনেক যুক্তি রয়েছে। আসল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবসম্মতভাবে আশা করতে পারে যে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান ছেড়ে দেবে? সৌদি আরব দুই দশকের বেশি সময় ধরে বলে আসছে যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হওয়ার পরই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব।

অনেকের ধারণা এটি কেবল দর-কষাকষির কৌশল, তবে প্রকৃতপক্ষে এটি একটি স্থায়ী কৌশলগত নীতি। ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে সৌদি আরব জানিয়েছিল, ইসরায়েল যদি দখলকৃত অঞ্চল থেকে সরে আসে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, তবেই আরব দেশগুলো সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সৌদি কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন, তাঁদের নীতির ভিত্তি এখনো এই কাঠামো। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে এটি কোনো সাময়িক অবস্থান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি।

গত এক দশকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দেশের অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিস্তৃত করেছেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। এর অংশ হিসেবে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং 'ভিশন ২০৩০'-এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই বাস্তববাদী পরিবর্তনের মাঝেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। তারা মনে করে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এই চুক্তি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং সৌদি পারমাণবিক খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখতে সহায়তা করবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে চীন উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং রাশিয়া ও বিভিন্ন মাঝারি শক্তির দেশগুলো কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো শক্তিশালী থাকলেও তা আর একক নয়।

এমন পরিস্থিতিতে শর্ত আরোপের কৌশলে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন। কূটনীতি তখনই সফল হয় যখন শর্তগুলো বাস্তবসম্মত এবং সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কোনো দেশকে তার গুরুত্বপূর্ণ নীতি বদলাতে বাধ্য করলে তা কার্যকর হয় না। গাজা যুদ্ধের ফলে আরব বিশ্বে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি বেড়েছে, যা ফিলিস্তিনের অধিকারকে পাশ কাটানো যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি সন্দেহ তৈরি করেছে। জনমতের এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া অসম্ভব। সৌদি নেতৃত্ব বারবার বলেছেন, তাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চান। এখানে সময়ের ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ; সৌদি আরব আগে ফিলিস্তিন সমস্যার বাস্তব অগ্রগতি চায়, তারপর স্বাভাবিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র যদি উল্টোভাবে আগে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত দেয়, তবে তা সৌদি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

বর্তমান বহুমুখী বিশ্বে প্রকৃত প্রভাব সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির চেয়ে মিত্রদের স্থায়ী স্বার্থের সঙ্গে নিজস্ব নীতি মিলিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে সাময়িক শক্তি প্রদর্শন করা গেলেও দীর্ঘস্থায়ী ফল পাওয়া যায় না। আট দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্ক টিকে থাকার মূল কারণ হলো পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া। এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে আবারও বাস্তববাদী হতে হবে।

বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। একে এমন একটি বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা, যেখানে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে অনড়, তা বাস্তব সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং কৌশলগত ক্ষতির কারণ হবে।

কূটনীতি সফল হয় বাস্তবতা স্বীকার করলে। যুক্তরাষ্ট্রের কাজ সৌদি আরবকে নীতি বদলাতে বাধ্য করা নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে আঞ্চলিক শান্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা একসঙ্গে সম্ভব হয়। একটির জন্য অন্যটি ত্যাগ করার শর্ত দিলে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না।

—আহমেদ আলতুয়াইজরি একজন সৌদি শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও কবি। (মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ)