বিখ্যাত গ্রিক গণিতজ্ঞ ইউক্লিডের এলিমেন্টস (ইউক্লিডীয় পদ্ধতি) শুধু জ্যামিতির একটি গ্রন্থ নয়—আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞানেরও অন্যতম ভিত্তি। রবিবার নয়, গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত একটি বিজ্ঞান বক্তৃতায় এসব কথা বলেন মহাবৃত্ত–এর সম্পাদক ও বিজ্ঞানবক্তা আসিফ। ‘মহাবিশ্বের জ্যামিতি: এলিমেন্টস, নন-ইউক্লীডিয় জ্যামিতি এবং রিলেটিভিটি’ শীর্ষক এ বক্তৃতায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন।

আসিফ বলেন, জ্যামিতির মৌলিক ধারণা ও যুক্তির কাঠামো না বুঝলে উচ্চতর বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় মৌলিক অবদান রাখা কঠিন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিজ্ঞান ও গণিতের মৌলিক প্রশ্নগুলোর দিকে নতুন করে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন; কারণ, জ্ঞানের ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, নতুন আবিষ্কার ও উচ্চতর গবেষণার সম্ভাবনাও তত বিস্তৃত হবে।

বক্তৃতায় আসিফ জানান, ১৯৯২ সালে ইউক্লিডের এলিমেন্টস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ও আলোচনা শুরু হয়। ত্রিভুজের কোণসমষ্টি বা জ্যামিতির অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলোর পেছনের যুক্তি ও কাঠামো বুঝতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন—জ্যামিতির প্রতিটি উপপাদ্য একটি সুসংগঠিত যৌক্তিক ব্যবস্থার অংশ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এলিমেন্টস-এর শক্তি শুধু ফলাফলে নয়; ফলাফলে পৌঁছানোর যুক্তিপদ্ধতিতেও।

ইউক্লিডের পাঁচটি স্বীকার্য ও পাঁচটি সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে প্রথম খণ্ডে ৪৮টি উপপাদ্য নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আসিফ। তিনি বলেন, কীভাবে অল্প কয়েকটি মৌলিক নীতি থেকে বিস্তৃত জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, তা এই পদ্ধতিতে দৃশ্যমান। তাঁর মতে, একটি উপপাদ্য আগের উপপাদ্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে; ফলে যৌক্তিক ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

আসিফ আরও বলেন, ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ইউক্লিডের এলিমেন্টস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন, আলবার্ট আইনস্টাইন, নিকোলাস কোপার্নিকাস, জোহানেস কেপলার ও গ্যালিলিও গ্যালিলেইর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তাঁদের বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে জ্যামিতির এই গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রসঙ্গ টেনে মহাবৃত্তের সম্পাদক বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের গভীরে যেতে হলে জ্যামিতির মৌলিক ধারণাগুলো আয়ত্ত করা জরুরি। তিনি ইউক্লিডের পঞ্চম স্বীকার্য বা ‘প্যারালাল পোস্টুলেট’ নিয়েও আলোচনা করেন। উনবিংশ শতকে ইয়ানোস বোলিয়াই, নিকোলাই লোবাচেভস্কি এবং পরে বার্নহার্ড রিম্যান এই স্বীকার্যকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করে নন-ইউক্লীডীয় জ্যামিতির পথ উন্মুক্ত করেন—এ কথা উল্লেখ করে আসিফ বলেন, এর ফলে প্রচলিত ধারণার বাইরে নতুন জ্যামিতিক জগতের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও আপেক্ষিকতার তত্ত্বে এর গুরুত্বের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের গণিতশিক্ষা প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসিফ বলেন, বিদ্যালয়ে জ্যামিতি পড়ানো হলেও তার যৌক্তিক কাঠামো ও প্রমাণপদ্ধতির ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় মৌলিক ধারণা না বুঝেই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে। আসিফের মতে, বিজ্ঞান ও গণিতের ভিত্তিগত বিষয়গুলো গভীরভাবে শেখানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।

বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, ইউক্লিডের পঞ্চম স্বীকার্যকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ হাজার ৩০০ বছর ধরে গণিতবিদদের মধ্যে বিতর্ক ও অনুসন্ধান চলেছে। তিনি বলেন, প্রথম চারটি স্বীকার্য তুলনামূলকভাবে সহজ ও স্বতঃসিদ্ধ মনে হলেও পঞ্চম স্বীকার্যের জটিলতা বহু গণিতবিদকে ভাবিয়েছে।

অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, এই স্বীকার্যকে অন্য স্বীকার্য থেকে প্রমাণ করা যায় কি না, কিংবা এটি বাদ দিলে কী ধরনের জ্যামিতি তৈরি হয়—এ প্রশ্নগুলো থেকেই পরবর্তীকালে নন-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির বিকাশ ঘটে। তিনি জানান, ইয়ানোস বোলিয়াই, নিকোলাই লোবাচেভস্কি ও বার্নহার্ড রিম্যান জ্যামিতির ধারণাকে আমূল বদলে দেন। বিশেষ করে রিম্যান জ্যামিতিকে আরও সাধারণ রূপে উপস্থাপন করে স্থান ও বক্রতার ধারণাকে নতুন মাত্রা দেন—এ কথাও বলেন তিনি।

বক্তৃতায় বুয়েটের এই শিক্ষক বলেন, বিমূর্ত গণিতচর্চা প্রথমে অনেকের কাছে ব্যবহারিক মনে না হলেও পরবর্তীকালে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে এর গভীর প্রয়োগ দেখা যায়। তাঁর মতে, স্থান-কালের বক্রতা ও মহাকর্ষের আধুনিক ব্যাখ্যা গড়ে উঠেছে এই গাণিতিক ভিত্তির ওপর।

মহাবিশ্বের জ্যামিতির প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, আধুনিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বৃহৎ পরিসরে মহাবিশ্ব প্রায় সমতল (ফ্ল্যাট) বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণ ও ব্যারিয়ন অ্যাকুস্টিক অসিলেশনের মতো পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন। তবে তিনি দেশে মৌলিক গণিতচর্চার দুর্বলতার দিকেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গণিত, জ্যামিতি ও বীজগণিত নিয়ে গবেষণার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে থেকে নতুন রিম্যান বা বোলিয়াই তৈরি করতে হলে মৌলিক গণিতশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার বলেন, বিজ্ঞানকে সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিজ্ঞানচিন্তা নিয়মিত ম্যাগাজিন প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা, বিজ্ঞান উৎসব ও বক্তৃতার আয়োজন করে থাকে। তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে যৌক্তিক চিন্তাচর্চা বাড়ানো এবং বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়া গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই এ বিজ্ঞান বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শেষ দিকে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার হিসেবে ছিল বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন বই। বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদনা দলের সদস্য উচ্ছ্বাস তৌসিফ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষক সফিক ইসলাম বক্তব্য দেন। ফটোসেশনের মাধ্যমে শেষ হয় বিজ্ঞান বক্তৃতার সব আয়োজন।