জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন ও ফ্যাসিবাদী কাঠামো থেকে মুক্তির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিচার এবং সংস্কার—দুই ক্ষেত্রেই উদ্যোগ জরুরি বলে বক্তারা মনে করেন। তবে সংস্কারের বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে প্রত্যাশামাফিক কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলেও আলোচনা সভায় মন্তব্য করা হয়।

আজ শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী পরিস্থিতি: সংস্কার ও বিচার’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অধিকার।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে দুই ধরনের চাওয়া ছিল। তার মতে, জুলাইয়ের একটি নিশ্চিত ফল এসেছে—১৭ বছর ধরে চেপে বসা ফ্যাসিবাদ ও জুলুম–অত্যাচার থেকে জনগণ মুক্তি পেয়েছে। পাশাপাশি আরেকটি চাওয়া ছিল রাষ্ট্রকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পক্ষে রায় দিয়েছেন; কিন্তু সে রায় এখনো কার্যকর করা হচ্ছে না।

আখতার হোসেন আরও বলেন, সরকার বলছে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, তবে কথার মধ্যে সংস্কার থেকে পিছিয়ে যাওয়ার একটি বাহানা খোঁজা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে দুই–তৃতীংয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবেই সংবিধান কাটছাঁট করতে পারবে—এমন ভাবনার প্রেক্ষিতে বিরোধী দলের কথাও কর্ণপাত করা হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের কাছ থেকে সংস্কার আদায় করা হবে বলেও তিনি হুঁমকি দেন।

জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্র করে চলা মামলাগুলোর বিচারকাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আখতার হোসেন বলেন, কিছু মামলার বিচার আইসিটিতে হচ্ছে, আবার কিছু বিচার অধস্তন আদালতে চলছে। তার মতে, আইসিটিতে বিচার যতটুকু অগ্রসর হচ্ছে সেটিও এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, কয়েকটি রায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো কবে কার্যকর হবে—তার কোনো দিশা নেই।

(কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া সরকার শুরু করবে এমন প্রত্যাশা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে দেশের মানুষ একটা ফ্যাসিবাদী দল এবং ফ্যাসিবাদী কাঠামো দুটো থেকেই মুক্তি লাভ করবে—এটাই প্রত্যাশার জায়গা। জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যেটা চেয়েছিলাম, ফ্যাসিবাদী শাসন ও ফ্যাসিবাদী কাঠামো থেকে মুক্তি—এটা আমাদের পেতে গেলে বিচার ও সংস্কার দুটোই করতে হবে।’

সরকারের উদ্দেশে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘আমরা চাই এই সরকার সফল হোক। এ জন্য বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নিজেদের করা ওয়াদাগুলো কীভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং সেটি খুবই দুঃখজনক। আমরা চাচ্ছি বিচার ও সংস্কারের এই যে লড়াই, যেটা জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মৌলিক জায়গা, সেই জায়গাতে সরকার বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি নিজেকে বলে তারা সংস্কারের জনক। তাদের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিজেদের সংস্কারের জনক হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবে তারা যেভাবে নিজেদের এখন হাজির করেছে, তাতে তাদের সংস্কারের হন্তারকের ভূমিকায় মনে হচ্ছে।

আলোচনা সভাটি পরিচালনা করেন অধিকারের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান। সভায় বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার, গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা, জাতীয় যুব শক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলাম, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম, শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা কবির হোসেন এবং জুলাই যোদ্ধা মোহাইমিন পুলক প্রমুখ।