রংপুর শহরের সর্বশেষ টিকে থাকা সিনেমা হল ‘শাপলা টকিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। দীর্ঘমেয়াদী লোকসান, দর্শক সংকট এবং সম্প্রতি ইজারাদারের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রংপুরে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত আর কোনো প্রেক্ষাগৃহ অবশিষ্ট থাকল না।

শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে হল ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন সিনেমা হলটি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

স্থানীয় প্রবীণদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে রংপুরে প্রথম সিনেমা হল হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ‘রংপুর ড্রামাটিক হল’, যা পরবর্তীতে ‘মডার্ন হল’ নামে পরিচিত হয়। সংস্কারের পর সেটি বর্তমানে ‘টাউন হল’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এরপর শহরে শাপলা টকিজ, দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল, চায়না টকিজ ও সেনা হলসহ মোট ১০টি সিনেমা হল গড়ে উঠেছিল। তবে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসার, ব্যবসায়িক মন্দা ও দর্শক কমে যাওয়ায় একে একে সবগুলো হলই বন্ধ হয়ে যায়।

মালিকপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন প্রয়াত মাসুম মিয়া সুস্থ বিনোদনের লক্ষ্য নিয়ে শাপলা টকিজ প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর মন্টু মিয়া হলটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে লোকসানের মুখে চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেনের কাছে হলটি ভাড়া দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, লোকসান সামাল দিতে চুক্তি ভঙ্গ করে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছিল। এতে পারিবারিক সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ায় মালিকপক্ষ হলটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।

মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন বলেন, ‘আমার চাচা প্রয়াত মাসুম মিয়া অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে হলটি চালিয়েছিলেন। অথচ ভাড়ায় পরিচালিত হওয়ার পর এতে অনৈতিক কাজের অভিযোগ ওঠে, যা আমরা মেনে নিতে পারিনি। রংপুর চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে শুক্রবার থেকে হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

তবে এই বিষয়ে ইজারাদার চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শাপলা টকিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ ও সংস্কৃতিকর্মীরা। প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মী আফজাল হোসেন বলেন, ‘শাপলা টকিজ শুধু সিনেমা হল ছিল না, এটি আমাদের ছেলেবেলার স্মৃতি। রংপুরের মতো বিভাগীয় শহরে কোনো সিনেমা হল না থাকা দুঃখজনক। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর দুর্বলতার প্রতীক।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুহুল আমিন বলেন, ‘ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগে সিনেমা হল টিকিয়ে রাখা কঠিন হলেও একটি বিভাগীয় নগরীতে অন্তত একটি প্রেক্ষাগৃহ থাকা উচিত। এই হলটি বন্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির বড় ক্ষতি হলো।’