জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা–কর্মীদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ টেনে দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে আবারও ভয়ের পরিবেশ ফিরে আসছে।
আজ শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
‘সম্প্রীতির জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অবদান’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজক এনসিপি ও বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা একটা ভয়ের পরিবেশ আবারও দেখতে পাচ্ছি। বিরোধী মতকে দমন–পীড়ন করার পুরোনো কায়দা আমরা এই সরকারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।’
তিনি জানান, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। তবে এই ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে জুলাই সনদের সঠিক বাস্তবায়ন, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং দেশে সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সরকার এসব ইস্যুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলে এনসিপি সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তিনি একই সঙ্গে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে সফল করতে এবং দেশের বর্তমান সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ছিল বলে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সব সম্প্রদায়ের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই এই আন্দোলন সফল হয়েছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে নয়, দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান সুবিধা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি।
বর্তমানে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার খবরের সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
‘জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়িত হয়নি’
আলোচনা সভায় সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রাল ও আর্চবিশপ হাউসের পরিচালক ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও বলেন, যে চেতনা নিয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল, সেই চেতনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এ বিষয়ে ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বিএনপি মুখে বললেও সেটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ হয়। সরকারের প্রতি তিনি অনুরোধ করেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে সরকার যাতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে। তিনি বলেন, এটা দেশের ১৭ কোটি মানুষের দাবি।’
বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের বলেন, ঐতিহাসিকভাবে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের সমান অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল।
তবে ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের বলেন, ‘যেই চেতনা নিয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ও ধর্মীয় উপাসনালয় আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু কোনো গণমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।’
আলোচনা সভায় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, জুলাইয়ের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গড়ার; যেখানে ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সবার অধিকার সমান থাকবে।
চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষ এখনো চেষ্টা করছে জুলাইকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করার। কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের যাঁরা জুলাইয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁরাই সাক্ষী জুলাই ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন। কাজেই বিষয়টি আমাদের সঠিকভাবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতভিটার ওপর সবচেয়ে বেশি হামলা ও দখল করেছে বিগত আওয়ামী লীগ। কিন্তু এসব ঘটনার বিচার হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। সারোয়ার তুষার বলেন, ‘নতুন যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি বা যেই বাংলাদেশের কথা আমরা বলছি, সেটা এখনো অর্জিত হয়নি।’
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব প্রীতম দাস। সঞ্চালনা করেন জাতীয় যুবশক্তির সহসভাপতি প্রলয় কুমার পাল ও জাতীয় ছাত্রশক্তির ধর্ম ও সম্প্রীতিবিষয়ক সম্পাদক জয় বিশ্বাস।