দুর্যোগপ্রবণ পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যালয় বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। শহরের ওয়াপদা ব্রিজ সংলগ্ন নিচু এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের (বিপিডিবি) এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়টি প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বন্যার পানির হুমকির মুখে পড়ে। এর ফলে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, বরং পুরো জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার অন্যতম নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত এই কার্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে বন্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান নেওয়া হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়েছে। জানা গেছে, সাঙ্গু নদীর পানি বাড়লেই প্রথম দিকে প্লাবিত হয় ওয়াপদা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা। অতীতের বিভিন্ন বন্যায় বিদ্যুৎ অফিস ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পানি প্রবেশ করায় জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা স্থানীয়দের মনে এখনও দুঃসহ স্মৃতি হয়ে রয়েছে। ওই সময় বিদ্যুৎ অফিসে বন্যার পানি প্রবেশ করায় দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ মোবাইল টাওয়ার বন্ধ হয়ে যায় এবং জেলার সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে প্রশাসনের উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়। অতীতের আরও কয়েকটি বন্যায় একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুন্না বলেন, "বিদ্যুৎ অফিসটি বন্যার মৌসুমে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকে। সামান্য পানি বাড়লেই আতঙ্ক তৈরি হয়। পুরো জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে এই অফিস জড়িত। তাই এটি উঁচু ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা খুবই জরুরি।"
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, "বন্যার সময় সবচেয়ে বড়ো সমস্যার একটি হলো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যায়। তখন উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ সবকিছুই ব্যাহত হয়।"
স্থানীয় বাসিন্দা উথোয়াইচিং মারমা জানান, "প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা উদ্বেগে থাকি। জেলার প্রধান বিদ্যুৎ অফিস যদি নিরাপদ স্থানে থাকত, তাহলে অনেক ঝুঁকি কমে যেত।"
শিক্ষক আবদুল করিম বলেন, "একটি জেলা শহরের প্রধান বিদ্যুৎ অফিস এমন নিচু এলাকায় থাকা ভবিষ্যতের জন্য বড়ো ঝুঁকি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।"
এ বিষয়ে বান্দরবান বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বিদ্যুৎ অফিস স্থানান্তর করা খুবই জটিল একটি বিষয়। তবে বন্যার সময় লাগাতার বৃষ্টিপাত হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকে। অফিসটি আরও উঁচুতে করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে বন্যার পানিতে ক্ষতির সম্মুখীন না হতে হয়।"
একই সঙ্গে তিনি স্থানান্তরের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর আশ্বাস দেন।
স্থানীয়দের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় প্রধান বিদ্যুৎ অফিসটি নিরাপদ ও উঁচু স্থানে স্থানান্তর অথবা আধুনিক বন্যা-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।