চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটির রাজস্ব বিভাগ। তবে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা বোর্ড। এই উদ্দেশ্যে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আজ শনিবার দুপুরে ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদনে বছরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানো সম্ভব। এর বেশি মূল্যবৃদ্ধি করতে হলে সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এই বিধান মেনেই আবাসিক ও বাণিজ্যিক—উভয় শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেছে রাজস্ব বিভাগ।
বোর্ড সভায় আলোচনার পর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষ্ণু কুমার দে-কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং বোর্ড সদস্য বেগম সৈয়দা জেরিন হোসেন ও রাসেল মিয়া। পরবর্তী বোর্ড সভার আগে এই কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেবেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আইন অনুযায়ী প্রতিবছর ৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব বিভাগ থেকে সে অনুযায়ী একটি প্রস্তাব এসেছে। তবে বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব পক্ষের মতামত জানতে চায়। কমিটি বিভিন্ন পেশাজীবী ও গ্রাহক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে। সে অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এক দফায় ৩৮ শতাংশ পানির দাম বাড়িয়েছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১৮ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩৭ টাকা। ওয়াসার সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট গ্রাহক সংযোগ ১ লাখ ৪ হাজার ৫১১টি, যার প্রায় ৯৩ শতাংশই আবাসিক। ফলে নতুন করে দাম বাড়লে সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।
ওয়াসার তথ্যমতে, ২০০৯ সালে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম ছিল ৫ টাকা ৪১ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ১৫ টাকা ৩২ পয়সা। ২০১৪ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ৬ টাকা ৯০ পয়সা ও ১৯ টাকা ৫৯ পয়সা হয়। ২০২০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা ৩০ পয়সা। এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দাম বাড়িয়ে আবাসিকে ১৩ টাকা ও বাণিজ্যিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবারও দাম বাড়ানো হয়। এরপর কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানান, আগে সংস্থার অধিকাংশ পানি সরবরাহ হতো গভীর নলকূপ থেকে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ধীরে ধীরে গভীর নলকূপ বন্ধ করা হচ্ছে এবং এখন সরবরাহের বড় অংশ আসছে নদীর পানি পরিশোধন করে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, বিদেশি ঋণের অর্থায়নে ওয়াসার বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, যার কিস্তি পরিশোধের দায় রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং ঋণ পরিশোধের আর্থিক চাপ এড়ানোর কথা বিবেচনা করেই মূল্যবৃদ্ধির এই প্রস্তাব আনা হয়েছে।