নদীভাঙনের আশঙ্কায় সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কেনা জমিতে দীর্ঘ ২১ বছর বসবাস করলেও এখন তা দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুরের জিয়ানগর (ইন্দুরকানী) উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামে। প্রতিবেশী দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই অভিযোগের পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

ভুক্তভোগী মোসাম্মৎ হিরন বেগম (৫৫) জানান, তার স্বামী আশরাফ আলী সরদার (৬২) পেশায় একজন জেলে। তাদের আদি নিবাস ছিল উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায়। নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে বাবার বাড়ির পাশে প্রায় ২৯ শতাংশ জমি কেনেন তারা। বর্তমানে ওই জমিতেই তাদের দুই ছেলে ও চার মেয়েসহ পুরো পরিবার বসবাস করে আসছে।

পরিবারটির অভিযোগ, সম্প্রতি পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সিদ্দিক বয়াতী (৬০) ও মো. মোতালেব শেখ (৫৮) ওই জমির মালিকানা দাবি করতে শুরু করেন। এই বিরোধের জেরে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেছেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ভুক্তভোগীরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও অভিযুক্তরা তাতে সাড়া দেননি বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, গত ২৮ জুলাই রাতে সিদ্দিক বয়াতী ও মোতালেব শেখের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জন লোক এসে জমির বেড়া ভেঙে সেখানে একটি পুরোনো দোকানঘর স্থাপন করে। বাধা দিতে গেলে পরিবারের সদস্যদের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ধাওয়া করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনায় হিরন বেগমের ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. হারুন অর রশিদ মীর বাদী হয়ে ইন্দুরকানী থানায় অভিযুক্ত দুজনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী হিরন বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নদীতে ঘরবাড়ি সব ভাইঙ্গা যাইতেছে। মুই ছয়টা মাইয়া-পোলা লইয়া থাহি মেলা কষ্টে। মেলা কষ্ট কইরা কিছু টাহা জমাইয়া এই জাগাডু কিন্না কোন রহমের এক্খান ঘর বানাইয়া থাহা শুরু হরছিলাম। কিন্তু ম্যালা বছর পর এহন মোগো বাঁধা দেয়, মোরা কিছু কইলে মোগো মারতে আয়। আম্নেগো কাছে বিচার দিলাম, মোরে এট্টু থাহার জায়গা কইরা দেন।’

তার ভাই মো. হারুন অর রশিদ মীর বলেন, “আমার এই অসহায় বোনের জন্য প্রায় ২১-২২ বছর আগে এই জমিটা কিনে দেওয়া হয়। নদীর পাড়ে ওদের ঘর ছিল, যা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখানে ডোবা ও খাল ছিল, সেগুলো বালি দিয়ে ভরাট করে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্দিক বয়াতী ও মোতালেব শেখের নেতৃত্বাধীন লোকেরা এসে বেড়া ভেঙে নিয়ে গেছে এবং অন্য এক জায়গা থেকে পুরোনো একটি দোকান তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে। আমাদের দলিলসহ সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলা দিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চলছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাই জমাদ্দার জানান, জেলে পরিবারের বেড়া ভেঙে রাতে একটি পুরোনো দোকানঘর বসানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি থানায় জানানোর পাশাপাশি প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সিদ্দিক বয়াতী ও মো. মোতালেব শেখ বলেন, “আমরা বেড়া ভাঙিনি, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিন্তু এই জমিতে আমরা পাওনাদার, তাই এখানে দোকান এনে রেখেছি।”

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল জানান, তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং ইউপি সদস্যকে দায়িত্ব দিয়েছেন। দুই পক্ষকে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হবে।

ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, “এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”