মরক্কো থেকে হাজার হাজার মানুষ স্পেনের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ার পর পরিস্থিতি ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্পেন বলছে, উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং আরও অভিবাসীর আগমন ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ছিটমহলটির নেতা দাবি করেছেন, মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউতায় ঢুকে পড়েছে। মাদ্রিদের হিসাব অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিশু রয়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার প্রায় ১৩ হাজার মানুষকে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মানুষ সীমানাপ্রাচীরের চারপাশ দিয়ে সাঁতরে ছিটমহলে ঢুকছেন; যাঁদের কয়েকজনের পরনে সাঁতারের পোশাকও ছিল। এই বিপজ্জনক যাত্রার জন্য তাঁরা লাইফ রিং ব্যবহার করেছেন।
মরক্কো থেকে সেউতায় পার হয়ে আসা জাদিদ জাকারিয়া বলেছেন, ‘আমরা এখানে আসতে পেরে সত্যিই খুব আনন্দিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমুদ্র পার হওয়ার অভিজ্ঞতাটা খুবই কঠিন ছিল। মরক্কোর পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ইচ্ছা ও দৃঢ়সংকল্পের কারণে আমরা এখানে পৌঁছাতে পেরেছি।’
স্প্যানিশ ভূখণ্ডে প্রবেশের পরপরই অনেকেই ‘ভিভা এস্পানা’ বা ‘স্পেন দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দেন।
মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত ছোট একটি স্প্যানিশ ভূখণ্ড ‘সেউতা’। মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত আরেকটি স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত শহর ‘মেলিইয়া’—এই দুটি স্থানই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র স্থল সীমান্ত।
মরক্কো থেকে সেউতায় বিপুল পরিমাণ অভিবাসী ঢোকার ঘটনা ইউরোপকে স্তম্ভিত করেছে এবং এ বিষয়ে নানা ধরনের মতভেদও তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স বলেছে, তারা স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্তে তল্লাশি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইতালি স্পেনকে ইইউয়ের অভ্যন্তরীণ মুক্ত সীমান্ত পরিকল্পনা থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করার হুমকি দিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মরক্কো সরকার সেউতার ফটকগুলোয় জলকামানবাহী ট্রাক মোতায়েন করেছে এবং সাধারণ মানুষকে পেছনের দিকে হটিয়ে দিয়েছে। স্পেনে ঢুকতে চাওয়া অভিবাসীদের সংঘর্ষের পর কাছেই পোড়ানো অবস্থায় একটি বাস এবং সাতটি গাড়ি পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্পেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা অবৈধভাবে ঢোকা অভিবাসীদের যত দ্রুত সম্ভব বের করে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে স্পেনের আদালতের রায়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে।
সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা সাধারণত কঠোর পাহারায় থাকা সীমান্ত এড়াতে বেশ খানিকটা দূরবর্তী উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার সাঁতরে পার হয়। কিন্তু এবার তাদের কোনো বড় ধরনের বাধার মুখে না পড়েই সীমানাপ্রাচীরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে।
কেউ কেউ প্রথমে পাথুরে সি-ওয়াল বা সমুদ্রদেয়াল ঘেঁষে হেঁটে এর শেষ প্রান্ত ঘুরে প্রবেশ করেন। আর বেশির ভাগ মানুষই পানিতে নেমে দেয়ালের চারপাশ দিয়ে সাঁতরে স্পেনের সৈকতে গিয়ে পৌঁছান।
সেউতে ও মেলিইয়া—প্রতিটি শহরই প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের আবাস্থল। এই দুটি শহরে সময়ে সময়ে ইউরোপে ঢুকতে চাওয়া অভিবাসী মানুষের অনুপ্রবেশের চেষ্টা দেখা যায়। তবে বৃহস্পতিবারের এই ঢলের পরিমাণের সঙ্গে তুলনীয় ঘটনা আগে তেমন দেখা যায়নি।
২০২১ সালের মে মাসের পর সেউতায় এবারই প্রথম সবচেয়ে বড় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটল। পশ্চিম সাহারা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ওই সময় হাজার হাজার মানুষ ছিটমহলটিতে প্রবেশ করেছিল।
মরক্কোর মানুষের নতুন এই ঢল কী কারণে শুরু হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আঞ্চলিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেল ভিক্টর তোরেস গতকাল বলেছেন, অভিবাসীদের এই বিপুল ঢল এই মাসের শুরুর দিকে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায়ও আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে। রায়ে বলা হয়েছিল, সেউতা বা মেলিইয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টাকালে সমুদ্রে আটকে পড়া ব্যক্তিদের বিশেষ নিয়মের অধীন ঢালাওভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
মরোক্কান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটসের (এএমডিএইচ) কর্মী জামিলা এল আবৌদি স্পেনের সংবাদমাধ্যম লা মঁদেকে বলেছেন, আদালতের ওই সিদ্ধান্তটি অভিবাসীদের সমুদ্রপথে সেউতার দিকে যেতে উৎসাহিত করেছে।
অন্যদিকে অন্যান্য ধারাভাষ্যকার অ্যালজেরিয়ায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সফরের কারণে মরক্কোর ক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করছেন। অ্যালজেরিয়া হচ্ছে স্পেনের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী দেশ।
২০২২ সালে মাদ্রিদ পশ্চিম সাহারায় অ্যালজেরিয়া-সমর্থিত স্বাধীনতাপন্থী পোলিসারিও ফ্রন্টের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ একটি ভূখণ্ড মরক্কোর স্বায়ত্তশাসনের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিল। তৎকালীন উত্তাপ প্রশমনে স্পেনের প্রয়াস হিসেবে সানচেজের এই সফরকে দেখা হচ্ছিল।
সীমান্তের মরক্কো অংশে নিরাপত্তাব্যবস্থার কড়াকড়ি জোরদার করা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ রাতারাতি ফেনাইদেক শহরে জড়ো হতে থাকে। সীমান্ত পার হওয়ার পথটি বন্ধ মনে হলেও সেখানে জড়ো হওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাচীরটি এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজার উপকূল ধরে এগোতে থাকে। কেউ কেউ সাঁতার কাটার প্রস্তুতি নেয়।
৩২ বছর বয়সী ইব্রাহিম (যিনি কেবল একটি নাম বলেছেন) বলেন, ‘আমার দেরি হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি রয়টার্সকে বলেন, তিনি তোয়েনজিয়ার (ট্যাঞ্জিয়ার) থেকে ফটক দিয়ে পার হওয়ার আশায় এসেছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখেন সেটি মূলত বন্ধ হয়ে গেছে।
সীমান্ত পার হওয়ার আশায় থাকা এসব মানুষের মধ্যে মরক্কো এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলোর নারী ও শিশুরাও ছিল।