ঢাকার কেরানীগঞ্জে গত চার দিনের ব্যবধানে পৃথক পৃথক ঘটনায় চারটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

সবশেষ শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক এলাকার ভেতর থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ খবর পেয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রতি শুক্রবার ছুটির দিনে সকালে তারা ঝিলমিল আবাসিক এলাকার ভেতর ফুটবল খেলতে আসেন। শুক্রবারও ফুটবল খেলার সময় বলটি দূরে চলে যায়। বল আনতে গিয়ে আগাছায় পূর্ণ খালি প্লটের মধ্যে অর্ধগলিত নারীর মরদেহ দেখতে পান। পরে ঘটনাটি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশকে জানালে তারা ঘটনাস্থল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে।

এর একদিন আগে, ৩০ জুলাই কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর এলাকা থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় অটোচালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়দের ধারণা, ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মরদেহটি ফেলে পালিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, গত ২৮ জুলাই কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ব্রাহ্মণকিত্তা এলাকার একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে তানজিলা নামে এক কিশোরীর গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় ঢাকা জেলা পুলিশ ব্যুরে অব ইনবেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বৃহস্পতিবার মো. রানা নামে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

পিবিআই জানায়, কিশোরী তানজিলার সঙ্গে অটোচালক রানার প্রেম ছিল। কিন্তু কিশোরী তানজিলার বাবা এই প্রেম মেনে নেননি। কিশোরী তানজিলা প্রেমিক রানাকে ৩০ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন। কিন্তু তানজিলার পরিবার প্রেমিক রানাকে প্রত্যাখ্যান করায় এবং ৩০ হাজার টাকা প্রেমিকা তানজিলাকে যাতে ফেরত না দিতে হয় সেজন্য রানা তানজিলাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৭ জুলাই রাতে কৌশলে প্রেমিকা তানজিলাকে ডেকে এনে ব্রাহ্মণকিত্তার একটি পরিত্যক্ত জায়গায় জবাই করে ফেলে পালিয়ে যায় রানা। পরে মডেল থানা পুলিশ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘাতক প্রেমিক রানাকে গ্রেপ্তার করে। নিহত কিশোরী তানজিলার বাড়ি কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকায়।

এছাড়া গত ২৮ জুলাই রাতে মডেল থানার খোলামোড়া এলাকায় মমতাজ বেগম নামে এক গৃহবধুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় মিন্টু নামে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, ঘটনার রাতে নিহত গৃহবধূকে মিন্টু তার বাসায় ডেকে আনে। কৌশলে জুসের সঙ্গে নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে পান করিয়ে গৃহবধূকে অচেতন করে। পরে মিন্টু গৃহবধূকে ধর্ষণ করে। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মিন্টু গৃহবধূ মমতাজ বেগমকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

গৃহবধূ মমতাজ বেগমের চুল কেটে এবং তার চেহারায় বিভিন্নভাবে আঘাত করে বিকৃত করে মরদেহটি তার ভাড়া বাসার পাশে ফেলে রাখা হয়। পুলিশ খবর পেয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। মডেল থানা পুলিশ প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে। মমতাজ বেগম মিন্টুর ভাইয়ের বাড়ির পাশেই এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

সার্বিক জেলা পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধ দমনে কেরানীগঞ্জের অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো অপরাধী আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়।

এই বিষয়ে কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জামিলুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "খোলামোড়ার মমতাজ হত্যা, কালিন্দীর তানজিলা হত্যা এবং রিকশাচালক লিয়াকত আলী হত্যা মামলার রহস্য ইতোমধ্যে সফলভাবে উদঘাটন করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত আসামিদেরও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"