২০১৬ সাল। মফস্‌সলের ধুলোবালি আর চেনা মানুষদের ছেড়ে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পা রেখেছিলেন এক কিশোর। নাম তাঁর শাওন আলী। লক্ষ্য ছিল একটাই—‘বড়’ ভলিবল খেলোয়াড় হওয়া। কিন্তু ইটের পর ইটে সাজানো এই অচেনা শহর এবং নিজের খেলার দুনিয়াটা শুরুতেই তাঁকে যেন গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল।

ঢাকার ইস্ট এন্ড ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর পরিবেশটা তাঁর কাছে পুরোপুরি নতুন হয়ে দাঁড়ায়। শুরুর সেই সময়গুলোর কথা মনে করতে গিয়ে শাওন বলেন, ‘শুরুটা খুবই কঠিন ছিল। অনেক কিছুই বুঝতাম না। খেলাটাও খুব জটিল লাগত। মাঝেমধ্যে মনে হতো, না, আর খেলবই না।’

রাজশাহীর কাপাসিয়ার সেই শাওনই এখন দেশের ভলিবলের পরিচিত নাম। গত বুধবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শেষ হওয়া সেন্ট্রাল এশিয়ান ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপের (কাভা) সেরা লিবেরোর (রক্ষণবিশেষজ্ঞ) স্বীকৃতি যোগ হয়েছে তাঁর সাফল্যের তালিকায়।

গ্রাম থেকে আসা সরল মনের এই ছেলেটির কাছে একসময় ভলিবলের ট্যাকটিকস, গতি আর জটিল সমীকরণগুলো পাহাড়সম কঠিন মনে হতো। খাপ খাওয়াতে না পেরে যখন হতাশা তাকে গ্রাস করছিল, তখনও তিনি থেমে যাননি। ইসলামাবাদ থেকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘চাচা বলেছিলেন, “তুইও একদিন নামকরা খেলোয়াড় হতে পারবি। নিজের প্রতি একটু বিশ্বাস রাখ।”’

সাদেক আলীও ছিলেন ভলিবল খেলোয়াড়। ২০১৮ সালে অবসরে যাওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ ভলিবল দলে খেলেছেন। চাচার এমন উৎসাহই শাওনকে নতুন করে লড়াইয়ের সাহস জুগিয়েছে বলে জানান।

ইস্ট এন্ড ক্লাবে শুরুর ধাক্কা সামলে শাওন থিতু হন তিতাস ক্লাবে। এরপর তাঁর ক্যারিয়ারের বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। তিতাস ক্লাবের জার্সিতে নিজেকে উজাড় করে দেন শাওন। শাওনের ভাষায়, ‘তিতাস ক্লাবেই আমার সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে।’

তিতাসের জার্সিতে প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি অনুশীলন তাঁকে আরও পরিপক্ব করে। একসময় যে জটিলতা বুঝতে হিমশিম খেতেন, তিনিই আজ ভলিবলে লিবেরোর দায়িত্বটা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝেন। তিতাস ক্লাবের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর ডাক আসে। এরপর আর পেছনে তাকানোর সুযোগ থাকেনি।

বর্তমানে শাওন আর সেই ‘না বোঝা’ অবুঝ ছেলেটি নন। দেশের ভলিবলে তিনি এখন পরিচিত মুখ—যিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দিতে দ্রুতগতির ডিফেন্স ও দক্ষতার সঙ্গে মাঠে ভূমিকা রাখেন।

চাচার হাত ধরে ভলিবলে আসা শাওন এখন অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা। তাঁর দেখাদেখিতে ছোট ভাই সবুজ আলীও ভলিবলে নাম লেখান।

চোখে-মুখে গর্বের আভা নিয়ে শাওন বলেন, ‘আমাকে দেখে আমার ছোট ভাইটাও ভলিবলে এসেছে। সে এখন সেনাবাহিনীর হয়ে খেলছে। সবুজ প্রায়ই আমাকে বলে, জাতীয় দলের জার্সি পরাটাই তার বড় স্বপ্ন। আমিও যখন সময় পাই, তাকে বিভিন্ন পরামর্শ দিই।’

ইসলামাবাদ থেকে করাচি হয়ে গতকাল ভোরে ঢাকায় পা রেখেছেন শাওন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সেরা লিবেরোর পদক এবং একবুক আত্মবিশ্বাস। এই পদকটি তাঁর কাছে শুধু একটি স্বীকৃতি নয়; অনেক লড়াই ও ত্যাগের ফল হিসেবেও তিনি দেখছেন।

মায়ের জন্য স্পৃহার উপহার—এভাবেই তিনি পদকটিকে ব্যাখ্যা করেন। জানান, ‘যেটিকে জ্বালানি বানিয়ে তিনি যেতে চান আরও উঁচুতে।’ তিনি একই সঙ্গে আগামী দিনের লক্ষ্যও তুলে ধরেন। শাওন বলেন, ‘আগামী বছর পাকিস্তানেই এসএ গেমস। আশা করি, আবার এখানে আসব। আসলে আমাদের একটা পদক খুবই দরকার। দলের অন্যরাও সেই অপেক্ষায়।’

শুরুটা যেমনই হোক, চেষ্টা আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো অচেনা দুনিয়াকেও যে জয় করা সম্ভব—শাওন তারই উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। তিনি এখন শুধু একজন ভলিবল খেলোয়াড় নন; স্বপ্ন চোখে বহু তরুণের প্রেরণার নামও।