পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বাসিন্দা মোক্তার হোসেনের জীবন এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে গত প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন তিনি। শৈশবে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে তার ডান পা অকার্যকর হয়ে যায় এবং ডান হাতটিও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। তবে এই সীমাবদ্ধতা তার জীবনযুদ্ধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
পাঁচ বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তার ডান পা প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। চরম আর্থিক অনটনের কারণে সে সময় একটি ক্রাচ কেনার সামর্থ্যও ছিল না তার পরিবারের। ফলে একটি লাঠির ওপর ভর করেই স্কুলে যেতেন তিনি। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন ছিল তার, কিন্তু দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে চলে আসে। অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার।
সংসারের খরচ মেটাতে প্রথমে একটি ছোট মুদিদোকান দিয়েছিলেন মোক্তার হোসেন। অবসর সময়ে এলাকার কিছু শিশুকে পড়ানো শুরু করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল দেখে ধীরে ধীরে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং একসময় দোকান ছেড়ে পুরোপুরি গৃহশিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
তবে লাঠির ভর দিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, আবার নিয়মিত রিকশায় চলার সামর্থ্যও ছিল না তার। এই সংকট কাটাতে তিনি সাইকেল চালানো শেখার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে ভারসাম্য রাখতে না পেরে অনেকবার পড়ে গেলেও হাল ছাড়েননি তিনি। শেষ পর্যন্ত এক পায়ে সাইকেল চালানো শিখে ফেলেন, যা পরবর্তীতে তার জীবনযুদ্ধের প্রধান সংগী হয়ে ওঠে। বর্তমানে বয়স বাড়লেও তিনি সেই একই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যাতায়াত করেন।
পারিবারিক জীবনে মোক্তার হোসেনের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ধারদেনা করে সম্প্রতি ছেলেকে শ্রমিকের কাজে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছেন তিনি। বর্তমানে পরিবারটি একটি টিনের ঘরে বসবাস করে।
নিজের জীবনসংগ্রামের কথা জানিয়ে মোক্তার হোসেন বলেন, "সংসারের দায়-দায়িত্বের কারণেই পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। এরপর টিউশনি শুরু করি। আমার পড়ানো শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করায় অন্যরাও সন্তানদের পড়ানোর জন্য নিয়ে আসে। এই টিউশনিই আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।"
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, "এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো কষ্ট করতে পারি না। সরকার থেকে শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়েছি। যদি আর একটু সহযোগিতা পেতাম, তাহলে পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।"
তার স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, "বিয়ের পর থেকেই কষ্ট করে সংসার করছি। দোকান করেছেন, ব্যবসাও করেছেন। শেষ পর্যন্ত টিউশনির ওপরই সংসার টিকে আছে। তারপরও স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সংসার চলে যাচ্ছে। কোন অভিমান ও রাগ নেই। সর্বদিকে থেকে আলহামদুলিল্লাহ।"
স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন মালিথা বলেন, "উনার জীবন অনেক সংগ্রামের। কষ্ট করেই সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। সেই কতকাল থেকে দেখছি সাইকেল চালিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রাইভেট পড়িয়ে বেড়ায়। সে আর কত সংগ্রাম ও কষ্ট করে যাবে। তার একটা গতি হওয়া দরকার।"
মোক্তার হোসেনের ভাতিজা স্বপন মিয়া বলেন, "ছোটবেলা থেকেই চাচাকে লাঠির ভর দিয়ে চলাফেরা করতে দেখছি। কয়েক বছর ধরে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ান। সরকার যদি তাকে সহযোগিতা করে, তাহলে অনেক উপকার হবে।"
এই বিষয়ে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা জানান, বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না, সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, "খোঁজখবর নিয়ে সরকারিভাবে সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখা হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সমাজের এমন সংগ্রামী মানুষদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। সরকারের একার পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রতিবন্ধকতা থাকে।"