ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার উলচাপাড়া গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন একটি বিশাল মুকুটমান ফটক। ফটকের দুই পাশে নান্দনিক কারুকাজে নির্মিত মিনার, আর ওই ফটক পেরোলেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো উলচাপাড়া শাহী জামে মসজিদ। কালের বহু আবর্ত পার হলেও আজও এই মসজিদ তার আভিজাত্য, ঐতিহ্য ও স্থপত্যসৌন্দর্য অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মসজিদটি বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের তালিকাভুক্ত বলে জানা যায়। চার ফুট উচ্চতার একটি শক্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে এটি চুন-সুরকি, ইট ও কালো পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত। পুরো ভবনজুড়ে পোড়ামাটির নান্দনিক অলংকরণ বিখ্যাত—jeta-টেরাকোটা প্রযুক্তির সুনিপুণ নকশায় সজ্জিত। মসজিদটির সৌন্দর্যে যোগ হয়েছে ছয়টি মিনার ও তিনটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ; এগুলো মসজিদটির ঐশ্বর্যকে আরও বাড়িয়েছে.
দুই অংশে বিভক্ত এই নির্মাণ-রীতিতে পশ্চিম অংশে নামাজের মূল কক্ষ এবং পূর্ব দিকে তিনগম্বুজবিশিষ্ট বিস্তৃত একটি বারান্দা রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, মসজিদটির নির্মাণ-শৈলী সপ্তদশ শতকে শুরু হয়েছিল; তবে এক প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৭২৭-২৮ খ্রিষ্টাব্দে শাহ সুজা নামীয় এক বণিকের নির্দেশে বা উদ্যোগে এটি নির্মাণ করা হয়।
মসজিদটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছেন হাফেজ মাওলানা উবায়দুল্লাহ। তিনি টানা ২১ বছর এখানে ভাবগম্ভীর পরিবেশ বজায় রেখে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থ থাকায় মসজিদের দেখাশোনা ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মাওলানা আখতারুজ্জামান, যিনি তার পরিবর্তে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা চালু-চালনা করছেন। তারা জানান, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাস নুরাগী ও দর্শনার্থীরা এই স্থাপনাটি দেখতে আসেন।
মসজিদে ইতিকাফরত স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বর্ণনা করেন, “তার বাবা এনায়েত আলী বহু বছর এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১০৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।” এইভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে মসজিদটির সঙ্গে তাঁদের নিরন্তর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন।
উলচাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের প্রভাষক মোবারক হোসেন বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকে প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে এটি সংস্কারের সুযোগ না থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রক্ষা করতে সরব ভূমিকা রাখছে।
ভাসানী চর্চা কেন্দ্রের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুন নূর বলেন, “শুধু ধর্মীয় অনুশীলনের কেন্দ্র না হয়ে উলচাপাড়া শাহী জামে মসজিদ আজ ইতিহাস, স্থাপত্যশিল্প ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।” তিনি আরও জানান, প্রায় ৩০০ বছর ধরে এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৌরবময় অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে।