কুমিল্লার দাউদকান্দির স্বল্প পেন্নাই গ্রামে মাত্র এক শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী বসতঘর। দৈর্ঘ্যে ৮৫ ফুট হলেও প্রস্থ মাত্র ৫ ফুট। সীমিত জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নির্মিত এই ঘরটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এখন প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এটি দেখতে আসছেন।

ঘরটি সৌদি আরব প্রবাসী মো. শাহজালালের। স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, আগে জায়গাটি ডোবা ছিল। সেটি ভরাট করে চলতি বছরের জুন মাসে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে টিনের ছাউনি ও বেড়ার এই ঘরটি নির্মাণ করেন শাহজালাল। বর্তমানে এই ঘরটিই ওই প্রবাসীর একমাত্র সম্বল।

শাহজালালের স্ত্রী খাদিজা আক্তার জানান, ২০১৩ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তখন শাহজালাল দেশে মাইক্রোবাস চালাতেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রথমে ইরাকে যান এবং তিন বছর পর দেশে ফেরেন। ২০১৬ সালে বাবা শহীদ উল্লাহর কাছ থেকে এক শতাংশ নিচু জমি কেনেন তিনি। এর আগে ২০১৬ সালেই পৈত্রিক ভিটায় একটি পাকা ভবন নির্মাণ শুরু করেছিলেন শাহজালাল। তবে প্রতিবেশী স্বজনরা জায়গা সংক্রান্ত একাধিক মামলা দায়ের করলে তিনি আইনি লড়াইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। ফলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কখনো স্বজনদের ঘরে, আবার কখনো খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শাহজালাল সৌদি আরবে যান এবং তাঁর পাঠানো টাকায় চলতি বছরের জুন মাসে এই ঘরটি নির্মিত হয়।

৫ ফুট চওড়া এই ঘরে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন খাদিজা আক্তার। তিনি বলেন, "ঘর ছোট হলেও মোটামুটি সব সুযোগ–সুবিধাই তাতে রয়েছে।"

তিনি আরও জানান, ঘরে ছয় ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থের একটি চৌকিতে সন্তানদের নিয়ে রাতে ঘুমান। সবার জায়গা না হওয়ায় চৌকির পাশে মোড়া রেখে তার ওপর কাঠ বিছিয়ে শোয়ার জন্য অতিরিক্ত জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরটির প্রবেশমুখে রয়েছে রান্নাঘর। এরপর খাবার ঘর, যেখানে রান্নার সামগ্রী রাখার একটি আলমারি রাখা। পরবর্তী অংশে শোয়ার কক্ষ, যেখানে ছয় ফুট দৈর্ঘ্য এবং তিন ফুট প্রস্থের চৌকি রাখা। এরপর রয়েছে ওয়্যারড্রোব ও স্টিলের একটি আলমারি রাখার জায়গা। সর্বশেষ অংশে পানি উত্তোলনের মোটর ও শৌচাগার অবস্থিত। ঘরের সামনে ১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও পাঁচ ফুট প্রস্থের চলাচলের পথ এবং পেছনে ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও পাঁচ ফুট প্রস্থের একটি খোলা বসার স্থান রাখা হয়েছে।

এই ব্যতিক্রমী ঘরটি দেখতে আসা নাজমুল হাসান, আমির আলী ও গিয়াস উদ্দিন জানান, এটি সত্যিই অসাধারণ একটি বসতঘর। তাঁদের মতে, ঘরটি নিজের চোখে না দেখলে পরিবারটির দুঃখ-কষ্ট ও সুখের অনুভূতি বোঝা সম্ভব নয়।

পরিবারটির মাথা গোঁজার ঠাঁই হওয়ায় খুশি স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিবেশী মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, "পরিবারটির বসবাসের জন্য কোনো জায়াগাই ছিল না। এতদিন অনেক কষ্টে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে দিন কাটিয়েছেন। অল্প জায়গার মধ্যে হলেও অবশেষে বসত ঘরটি নির্মাণ করতে পেরেছেন শাহজালাল। অবশেষে একটি স্থায়ী ঠিকানা হলো তাঁদের।"

একই কথা বলেন গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্য জাহানারা আক্তার। তিনি বলেন, "শাহজালাল দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও সীমিত বেতনের কারণে এবং পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ শেষে বসতঘর নির্মাণের জন্য জায়গা ক্রয় করার সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া স্বল্পপেন্নাই গ্রামে এক শতাংশ ডোবার জায়গা ক্রয় করতেও কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার প্রয়োজন হয়। তাই নিরুপায় পরিবারটি অল্প জায়গাতেই মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে।"