গুগলে কোনো পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য খুঁজতে গিয়ে অনেক ব্যবহারকারী সার্চ ফলাফলের প্রথম দিকের লিংকে ক্লিক করেন। সাধারণ ধারণা হলো, তালিকার শীর্ষে থাকা ওয়েবসাইটই বেশি নির্ভরযোগ্য। তবে এই বিশ্বাস সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। কারণ, প্রথমে দেখা লিংক অনেক সময় প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ফল নাও হতে পারে; বরং অর্থের বিনিময়ে স্পনসরড বিজ্ঞাপন হিসেবে সেটি সবার ওপরে প্রদর্শিত হয়। প্রতারকেরা এখন এই ব্যবস্থাকেই নতুন কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে। তারা পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ভুয়া ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে ব্যবহারকারীদের প্রতারণার ঝুঁকিতে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই ওয়েবসাইটগুলো এত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় যে অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীর পক্ষেও আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

.

কীভাবে চলছে প্রতারণা

প্রতারকেরা সাধারণত গুগলে স্পনসরড বিজ্ঞাপন হিসেবে নিজেদের তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইটকে সার্চ ফলাফলের শীর্ষে দেখায়। ওয়েবসাইটগুলোর নকশা, লোগো, রং, ভাষা এবং ওয়েব ঠিকানাও অনেক সময় আসল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিল রেখে সাজানো হয়। ফলে ব্যবহারকারীরা সহজেই সেগুলোকে প্রকৃত ওয়েবসাইট বলে ধরে নিতে পারেন। এসব সাইটে কখনো নকল পণ্য বিক্রি করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য আরও গুরুতর—ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা, সেই সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড বা লগইন–সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নেয়া। পরে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে গোপনে অর্থ চুরি, অনলাইন অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ বা পরিচয় জালিয়াতির মতো অপরাধ করা হতে পারে।

এ ধরনের প্রতারণা কেবল গুগলেও সীমাবদ্ধ নয়। বিংয়ের মতো অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিন এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ধরনের ভুয়া স্পনসরড বিজ্ঞাপন দেখা যায়। তবে সব স্পনসরড বিজ্ঞাপনই প্রতারণামূলক নয়। বহু প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে সার্চ ফলাফলের শীর্ষে আসে। মূল সমস্যা হচ্ছে, আসল ও নকল বিজ্ঞাপনের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ায় প্রতারকেরা সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে।

.

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা–গবেষক ডেমন ম্যাককয়ের মতে, প্রতারণামূলক ওয়েবসাইটগুলো প্রায়ই এমন অর্থপ্রদানের পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলে, যেখান থেকে অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন। অনেক সময় বড় ধরনের ছাড়ের লোভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের ব্যাংকে বা অন্যান্য বিকল্প মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে রাজি করানো হয়। এসব ওয়েবসাইটে ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যও চাওয়া হতে পারে। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা বা বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ করা হয়।

.

প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ঠেকাতে গুগলের উদ্যোগ

প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, অনেক ভুয়া বিজ্ঞাপন সাধারণ ব্যবহারকারীদের সামনে আসার আগেই সরিয়ে ফেলা হয়। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণাসংশ্লিষ্ট ৬০ কোটি ২০ লাখের বেশি বিজ্ঞাপন এবং ৪০ লাখ অ্যাকাউন্ট অপসারণ করেছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও আরও কঠোর করা হয়েছে।

.

ভুয়া স্পনসরড বিজ্ঞাপন চিনবেন যেভাবে

প্রতারকেরা সাধারণত ব্যবহারকারীদের মধ্যে তাড়াহুড়ার অনুভূতি তৈরি করার চেষ্টা করে। ‘মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অফার শেষ’ বা ‘এখনই ব্যবস্থা না নিলে সব তথ্য হারিয়ে যাবে’—এ ধরনের বার্তা দেখলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ওয়েবসাইটের ঠিকানাও ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে। পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন, অতিরিক্ত অক্ষর বা সংখ্যা যুক্ত থাকলে সেটি প্রতারণার ইঙ্গিত হতে পারে। কম দামের অফার অস্বাভাবিক মনে হলে, কেবল নির্দিষ্ট বিকল্প মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ থাকলে বা ওয়েবসাইটজুড়ে বানান ও ভাষাগত ভুল থাকলে সেটিও ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।

.

নিরাপদ থাকবেন যেভাবে

সাইবার নিরাপত্তা–বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে কেনাকাটা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য খোঁজার সময় স্পনসরড লিংকে ক্লিক করার আগে ওয়েব ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। সম্ভব হলে নিচে থাকা স্বাভাবিক সার্চ ফলাফল থেকে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। ভুলবশত কোনো ভুয়া ওয়েবসাইটে অর্থ পরিশোধ বা ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ফেললে দ্রুত ব্যাংক বা কার্ড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। প্রয়োজনে কার্ডটি বন্ধ করে নতুন কার্ড নিতে হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড পরিবর্তনসহ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানোর কথাও বলা হয়।

.

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট