২০২৬ সালের ২৫ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। একই অভিযোগে ২০২৪ সালে তিনি পদত্যাগের দাবির মুখে পড়েছিলেন, কিন্তু তখন গদি নড়েনি। দুই বছরের ব্যবধানে, প্রায় একই অভিযোগে, এবার মাত্র কয়েক সপ্তাহের চাপের মুখে তাকে পদ ছাড়তে হলো। প্রশ্ন উঠছে, কেন এবার পরিণতি ভিন্ন হলো? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সফলতার কারণ।

এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্যের পর। বিজেপির নামের ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠিত হলে, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ নিবন্ধন এবং দুই কোটির বেশি অনুসারী জুটিয়ে নেয় সংগঠনটি, যা বিজেপি ও কংগ্রেসের অনলাইন অনুসারী সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।

রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পরিচিত ছকের পুনরাবৃত্তি। বলা হয়, সিজেপির অধিকাংশ অনুসারী নাকি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দিপক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা তথ্য উপস্থাপন করে দেখান, প্রায় ৯৫ শতাংশ অনুসারীই ভারতীয়, পাকিস্তান-বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচেও নেই। তথ্য-প্রতিরোধের এই সহজলভ্যতা একটি গভীরতর রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।

বিজেপি শাসনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে বিভিন্ন তকমা দিয়ে প্রান্তকরণ করা। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে শাহিনবাগে মুসলিম নারীদের ১০১ দিন অবস্থানকে ‘মুসলিম–পক্ষপাত’ ও ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়েছিল। জেএনইউ থেকে যাদবপুর পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনগুলোকেও একই কৌশলে ‘আরবান নকশাল’ ও ‘বাম ষড়যন্ত্র’ তকমা দেওয়া হয়েছিল। কৃষক আন্দোলনেও ‘টুলকিট’ ও ‘খালিস্তানি অনুপ্রবেশ’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কৌশল ছিল অভিন্ন, প্রতিবাদকে ইস্যুভিত্তিক নাগরিক অসন্তোষ হিসেবে না দেখিয়ে সাংস্কৃতিক-নিরাপত্তাজনিত হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা। চেষ্টা করা হতো, সাধারণ মধ্যবিত্ত হিন্দু ভোটারের সঙ্গে আন্দোলনের দূরত্ব বজায় রাখা।

সিজেপির ক্ষেত্রে এ কৌশল ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই তকমা দাগানোর মতো উপাদানের অনুপস্থিতি। নেতৃত্বে কোনো পরিচিত বাম দল নেই, সামনের সারিতে কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠন নেই, গ্রামীণ কৃষকও নেই। যন্তর মন্তরে হাজির হয়েছে কোচিং সেন্টারের ছাত্র, ছোট শহরের চাকরিপ্রত্যাশী, নতুন স্নাতক এবং গিগ-অর্থনীতির কর্মী, অথচ সুযোগ থেকে বঞ্চিত এক নাগরিক—মধ্যবিত্ত।

এদের ‘জিহাদি’ বা ‘আরবান নকশাল’ বলা কঠিন, কারণ, এরা একই সঙ্গে মোবাইল-অ্যাপনির্ভর সেবা, ডিজিটাল লেনদেন এবং স্টার্টআপ-সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশীদার। রাষ্ট্রের পুরোনো তকমা দাগানোর রাজনীতি এই প্রথমবারের মতো একটি প্রকৃত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।

আন্দোলনের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য ছিল এর ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্য–সংস্কৃতি। সিজেপি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর সংগঠন হওয়ায় আন্দোলনটি শুরু থেকেই ভেবেছে, কোন মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরা পড়ছে, কোন স্লোগান হ্যাশট্যাগ হয়ে উঠতে পারে। এই দৃশ্য-সচেতনতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইউটিউব চ্যানেল আনফিল্টার্ড বাই সামদিশ-এর কভারেজে বারবার শোনা এক সাধারণ আহ্বান, ‘ক্যামেরাপারসন পার্থ, দেখাইয়ে’। সাংবাদিক সামদিশ ভাটিয়া প্রতিটি সংঘর্ষের মুহূর্তে যেভাবে তাঁর ক্যামেরাপারসনকে ডাকতেন, তা শিগগিরই দর্শকদের কাছে একধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

এর ফলস্বরূপ, আগে যেখানে রাষ্ট্রের সহায়ক সংবাদমাধ্যম-কাঠামো একতরফা আখ্যান নির্মাণ করতে পারত, সেখানে এখন হাজারো ব্যক্তিগত ফোন-ক্যামেরা এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র সাংবাদিকের ভাইরাল উপস্থিতি সেই আখ্যান-নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়েছে।

এই দৃশ্য-ক্ষমতার নিচে কাজ করছে আরেকটি গভীরতর মানসিক পরিবর্তন। এই প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে অ্যাপনির্ভর সেবা-অর্থনীতির যুগে, যেখানে অভিযোগ জানানো মানেই তাৎক্ষণিক সাড়া, দৃশ্যমান জবাবদিহি এবং প্রয়োজনে বিকল্প সেবায় স্থানান্তরের অধিকার প্রত্যাশিত। রাষ্ট্রের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও অনেকটা সেই একই যুক্তিতে গঠিত: নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদি অনুনয়-বিনয়কারী প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং একটি চুক্তিবদ্ধ সেবা-সম্পর্কের অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা।

এই মনস্তত্ত্বের কাছে রাষ্ট্রের চিরাচরিত ভয়-নির্ভর ভাষা, লাঠি, গ্যাস, বিদেশি হাতের অভিযোগ, ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রায় একই সময়ে হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দেওয়া এক নারীর দিপকের গায়ে কালি ছোড়ার ঘটনা, দুটোই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আরও বেশি টেনে আনে। এই প্রতিটি ঘটনাই ডিজিটাল পরিসরে সহানুভূতি ও দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে।

এই সাফল্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে পৌঁছাবে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্য খোলাই থেকে যায়। ভারতের লোকপাল আইনের ইতিহাস সতর্ক করে দেয়, দ্রুত প্রতীকী জয় সব সময় গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনে পৌঁছায় না; আইন প্রণয়নের পরও বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর। তবু অন্তত এই মুহূর্তে এতটুকু স্পষ্ট, রাষ্ট্রকে জবাবদিহির টেবিলে টেনে আনার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ তৈরি হয়েছে।

এর পেছনে নিরেট অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। ভারতের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুনে তরুণ বেকারত্বের হার (১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে) দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ, ২০২৫ সালের এপ্রিলের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া প্রতিবেদন বলছে, বেকার তরুণদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই স্নাতক, অথচ পুরুষ স্নাতকদের মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ স্থায়ী বেতনভুক্ত চাকরি পান, প্রকৃত কেতাদুরস্ত পেশাগত চাকরিতে ঢুকতে পারেন মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রশ্নটা তাই কেবল জাতীয় টেস্টিং এজেন্সির পরীক্ষা জালিয়াতির নয়, বা সিবিএসইর মূল্যায়ন ত্রুটিরও নয়; প্রশ্নটা একধরনের যৌথ অভিজ্ঞতারও। যে প্রজন্মকে রাষ্ট্র ‘মেধাতন্ত্রের সন্তান’ বলে চিহ্নিত করতে চায়, অথচ বাস্তবে সেই মেধাতন্ত্র নিয়মিত ভেঙে পড়ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতার তলায়।

ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কর্মহীনতার এই বাস্তবতাই রাষ্ট্রের যোগ্যতার ওপর সংশয় তৈরি করেছে এবং কৌতুকের আড়ালে জমে থাকা প্রকৃত ক্ষোভের রসদ জুগিয়েছে। ২০২৪ সালেও যখন একই অভিযোগ উঠেছিল, তখনো এই ক্ষোভের মাত্রা এতটা প্রকট ছিল না। প্রতিবাদও ছিল মূলত সংসদকেন্দ্রিক। দুই বছরের ব্যবধানে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই এবার রাস্তায় নেমে এসেছে।

সবচেয়ে ব্যক্তিগত তুলনাটা টানা যায় ওয়াংচুকের নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে। লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তি ও রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তিনি ২০২৪ সালের মার্চে একুশ দিন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পঁইত্রিশ দিন অনশন করেছিলেন, দুই দফাতেই সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর আংশিক ছাড় মিললেও মূল সাংবিধানিক দাবি অধরাই থেকে গেছে।

এবার সিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে ২৮ জুন থেকে মাত্র ছাব্বিশ দিনের অনশনে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবি বাস্তবে রূপ নিল। শরীর একই, ত্যাগও একই, রাষ্ট্রও একই, তফাত কেবল কৌশলে, একদিকে দীর্ঘ, একলা, আত্মত্যাগনির্ভর রাজনীতি, যেখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ধীর দর-কষাকষির, অন্যদিকে দ্রুত, সমষ্টিগত, তথ্যনির্ভর ও ব্যঙ্গাত্মক দাবি আদায়ের রাজনীতি, যেখানে লাখ লাখ তরুণ নিজেদের রোজকার ডিজিটাল অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে যে প্রতিকার চাইতে দেরি করার প্রয়োজন নেই।

শুরুতেই যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে তার উত্তর আছে এই তিনের মিশেলে। প্রথমত, বিজেপি শাসনের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র, অর্থাৎ তকমা দাগানো, এখানে কার্যকর হয়নি। কারণ, আন্দোলনের সামাজিক গঠন সেই তকমা উপযোগী উপাদান সরবরাহ করেনি।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের ভয়নির্ভর দমনযন্ত্র কৌতুক ও স্বাধীন দৃশ্য-সাংবাদিকতার মুখে ভোঁতা হয়ে পড়েছে। প্রতিটি দমন-পদক্ষেপ উল্টো সহানুভূতি ও দৃশ্যমানতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তৃতীয়ত, স্নাতক-বেকারত্বের নির্মম বাস্তবতা আন্দোলনকে এমন এক নৈতিক ভিত্তি জুগিয়েছে, যা নিছক কৌতুককে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই তিনের মিশেলেই ২০২৪ সালে যা অসম্ভব ছিল, তা ২০২৬ সালে সম্ভব হয়েছে।

এই সাফল্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে পৌঁছাবে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্য খোলাই থেকে যায়। ভারতের লোকপাল আইনের ইতিহাস সতর্ক করে দেয়, দ্রুত প্রতীকী জয় সব সময় গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনে পৌঁছায় না; আইন প্রণয়নের পরও বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর। তবু অন্তত এই মুহূর্তে এতটুকু স্পষ্ট, রাষ্ট্রকে জবাবদিহির টেবিলে টেনে আনার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে কৌতুক, তথ্য-স্বচ্ছতা আর স্বাধীন দৃশ্য-সাংবাদিকতা মিলেমিশে রাষ্ট্রের পুরোনো তকমানির্ভর ও ভয়নির্ভর রাজনীতিকে অকার্যকর করে দিতে পারে।