টুথপেস্টের পর এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপণ্যে অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। এই তথ্য সামনে আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে এবং বাংলাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি; তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে বলে গবেষকদের মত।
খাবারে এই ক্ষতিকর কণা প্রবেশের তিনটি প্রধান পথ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা থেকে কণাগুলো খাবারে মিশছে। এছাড়া কারখানার মেশিন, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্টের ক্ষয় এবং পরিবেশ দূষণের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও প্রাণী ও কোষের ওপর গবেষণায় উদ্বেগজনক ফল পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে পৃথিবীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ ছয়গুণ বেড়েছে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অংশে।
লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের গবেষক স্টেফানি রাইট ২০২৫ সালের শুরুতে এক গবেষণায় জানান, প্লাস্টিকের সিলযুক্ত টি-ব্যাগ গরম জলে ডোবানো বা প্লাস্টিকের পাত্রে তরল পদার্থ মাইক্রোওয়েভে গরম করার মাধ্যমে প্রতিদিন মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে প্লাস্টিক গ্রহণের ক্ষেত্রে হিটিং এবং গরম জল সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি, এবং এটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের জিনিসপত্র থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রক্তপ্রবাহে পৌঁছানো কণাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তবে প্রাণী ও টেস্ট টিউবের গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা একজন সাধারণ সুস্থ ব্যক্তিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সে সম্পর্কে আমাদের কাছে প্রায় কোনো তথ্যই নেই।’
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে চীনের এক গবেষক জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সার্জারি করা রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পান। একই বছরের শুরুতে ইতালির গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ের হৃদ্রোগীদের ক্যারোটিড ধমনীতে এই কণা শনাক্ত করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের নেতৃত্বাধীন এক দল মানব মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পান। অধ্যাপক ক্যাম্পেন জানান, যাদের মৃত্যুর আগে ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে ইতালির এক গবেষণায় হৃদ্রোগীদের ঘাড়ের প্রধান রক্তনালিতে জমা চর্বিতে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী তিন বছরে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা গেলেও শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণেই এমনটা হয়েছে কি না, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-ও জানিয়েছে, খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকছে, তবে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
এদিকে, বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, “পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্রান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ বলা সঠিক হবে না।”
বিএসটিআই জানিয়েছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও পরীক্ষাপদ্ধতি চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল ও উপাদানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
বিএসটিআই-এর মতে, শুধু কণা পাওয়া গেলেই কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করে তা ব্যবহার করেছে, এমনটা বলা যায় না। তবে কোনো পণ্য মান পূরণে ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।