বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সব স্তরে সম্পর্ক বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, আলোচনা ‘খুব ভালো’ হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর বলেছেন, সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করতে পেরে তিনি ‘আনন্দিত’।
তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছান সার্জিও গর। সফরের প্রথম দিন তিনি সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সন্ধ্যা ছয়টার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত তাঁদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। এরপর খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিট একান্তে কথা বলেন সার্জিও গর। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মার্কিন দূত প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা করেন। সেখানে দুই পক্ষ ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদারত্বসহ সম্পর্কের সামগ্রিক বিষয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় করে।
সফরের প্রথম দিন সরকারি পর্যায়ে একটি আলোচনাই ছিল বলে জানা গেছে। তবে আলোচনার পর পদ্মায় নৈশভোজের কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে সেটি হয়নি।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে সার্জিও গর প্রায় অভিন্ন কথা উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমার প্রথম বাংলাদেশ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করতে পেরে আমি আনন্দিত। অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটেছে।’
এরপর রাত সাড়ে আটটার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বৈঠকের বিষয়ে কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন বিদ্যমান। এটাকে আরও কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে ব্যাপারে আমরা ইতিবাচক আলোচনা করেছি।’
খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অভিবাসন—সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গরের কথা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ওই সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক এখন একটা অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে অর্জিত সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাব।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সুতরাং আমি ধরে নেব, এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগ নেই।’
প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান বলেন, ‘প্রতিরক্ষার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আর জ্বালানি সহযোগিতা তো আমাদের চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের একটা জ্বালানি সমঝোতা আছে। জ্বালানি নিয়ে আমরা বিশ্বের নানা দেশের সহযোগিতা চাইছি, সবার সঙ্গেই কথা বলছি।’
রোহিঙ্গাদের অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করব যে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে এই সমস্যার সমাধানে আমরা যে বহুপাক্ষিক যে প্রচেষ্টা নিয়েছি, সবাই তাতে সহায়তা করবে।’
ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সরকার প্রথম দিন থেকে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং শুধু এটা একটি বৈঠকে সীমাবদ্ধ নয়, আমরা সব স্তরেই তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা রাখছি এবং সম্পর্কটা এগিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, বৈঠকে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে কোনো আলোচনা হয়নি। খলিলুর রহমান জানান, এ বিষয়ে আলোচনা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনা চলছে—সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু তোলেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখবেন মার্কিন দূত সার্জিও গর। সফরের শেষ দিনে শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
মার্কিন ধনকুবের সার্জিও গর ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে তাঁকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব দেন ট্রাম্প। গত জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসেছেন তিনি।
রাতে এক এক্স বার্তায় সার্জিও গর লেখেন, ‘আজ সন্ধ্যায় আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অবহিত করেছি যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলে বিবেচনা করেছে এবং বাংলাদেশকে ভ্রমণের জন্য আরও নিরাপদ বলে মনে করেছে। তদনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক ভ্রমণ সতর্কতা (ট্যুরিস্ট অ্যাডভাইজরি) লেভেল ৩ থেকে কমিয়ে ২ করা হয়েছে। তবে অল্প কিছু এলাকায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ রয়েছে এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত। দারুণ খবর!’