উপকূলীয় মেঘনা নদীবেষ্টিত লক্ষ্মীপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা সরকারি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি গত তিন বছর ধরে অব্যবহৃত ও বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। ইঞ্জিন খুলে নেওয়া, কাঠামোর অংশ নষ্ট হওয়া এবং লোহায় মরিচা ধরার ফলে চিকিৎসাসেবার জন্য কেনা এই সম্পদটি এখন অবহেলা ও অপচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

২০২২ সালের অক্টোবরে সরকারি উদ্যোগে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোসেন আকন্দ এর উদ্বোধন করেন। তবে অল্প কিছুদিন সীমিত পরিসরে চলার পর দ্রুতই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের পর এই সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি কার্যত সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসেনি। বরং শুরুর দিকে এটি রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হয় বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে নৌযানটিকে একটি খালের পাশে ফেলে রাখা হয় এবং এরপর থেকে আর কখনও চিকিৎসাসেবায় ব্যবহার করা হয়নি। অথচ চালকের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও পরিচালনা ব্যয়সহ প্রকল্পটির পেছনে সরকারি ব্যয় হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা ও তদারকির অভাবে চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ এই সেবার সুফল পাননি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালপাড়ে নৌযানটি এখন ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে। এর ইঞ্জিন খুলে নেওয়া হয়েছে এবং লোহার অংশে মরিচা ধরে কাঠামোর বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৩৮৯ জন। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানকার মানুষের জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি অকেজো থাকায় জরুরি রোগীদের এখনও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ আব্দুল্লাহ বলেন, "পাঁচজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একজন সাত দিন করে পাহারা দিত। তিন বছর ধরে এই অ্যাম্বুলেন্স এখানে পড়ে আছে। মানুষের কোনো কাজে আসেনি। যদি চালু থাকত, সরকারের ডাক্তার ও ওষুধ নিয়ে চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যেত। গরিব মানুষ অনেক উপকার পেত। কিন্তু কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। খালের পাড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"

চরের বাসিন্দা মো. আজগর হোসেন বলেন, "প্রসূতি মা বা গুরুতর রোগীকে হাসপাতালে নিতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হয়। আনা-নেওয়ায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ সরকারি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি বছরের পর বছর পড়ে আছে।"

চর গজারিয়ার বাসিন্দা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, "উদ্বোধনের পর কোনো রোগী সেবা পাননি। গত তিন বছর ধরে এটি বন্ধ। কোনো যোগাযোগ নম্বরও দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনের সময় আমরা কোনো সুবিধা পাই না। ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। এতে এর অনেক যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে গেছে।"

একই এলাকার ফরহাদ হোসেন বলেন, "জরুরি রোগী পরিবহনে এখনও নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় নৌকা পাওয়া যায় না। এতে রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।"

এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামনাশিস মজুমদার বলেন, "ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটির সেবা বন্ধ থাকায় চরবাসী নিয়মিত অভিযোগ করছেন। জরুরি সময়ে রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে আনতে না পারায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত এটি চালু করা প্রয়োজন।"

অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, "ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন অচল রয়েছে। দ্রুত মেরামত করে চরাঞ্চলের রোগী পরিবহনের জন্য এটি চালু করা হবে।"