মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হককে হাজির হতে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে অবস্থান করছেন।
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের এক অভিযানে নিহত হন মেজর (অব.) জাহিদুল। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম গত বছরের ১০ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তাঁর স্বামী জাহিদুলকে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে এবং তাঁর দুই কন্যাশিশুকে ৪ মাস ৭ দিন গুম করে রাখার অভিযোগও আনেন তিনি।
মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) তৎকালীন প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদ আলম এবং রূপনগর থানা-পুলিশের তৎকালীন অজ্ঞাতনামা সদস্যরা।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জেবুন্নাহারকে তাঁর দুই শিশুসন্তানসহ চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে বন্দী করে রাখেন। পরের দিন জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি তাঁর স্বামীর অবস্থান জানতে চাইলে আসামিরা তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে জঙ্গি বলে দাবি করেন এবং স্বীকারোক্তি না দিলে তাঁকে তাঁর স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে আসামিদের একজন স্বীকার করেন যে, তাঁরাই তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছেন।
জেবুন্নাহার অভিযোগ করেন, জাহিদুল হত্যার পর তাঁদের ওপর অমানবিক, নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম নির্যাতন চালানো হয়। তিনি বলেন, "জঙ্গি নাটক করে তাঁকে, তাঁর মেয়েদের ধরে নিয়ে ডিবির কথিত আয়নাঘরে ৪ মাস ৭ দিন গুম করে রাখা হয়। তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে চলে অমানুষিক নির্যাতন। স্বামীকে জঙ্গি বলে স্বীকার করার জন্য তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, স্বীকার না করলে তাঁকে ও দুই মেয়েকে স্বামীর মতোই পরিণতি ভোগ করতে হবে।"
অভিযোগে আরও বলা হয়, দীর্ঘ সময় স্বীকারোক্তি না পেয়ে আসামিরা তাঁর বড় মেয়েকে আলাদা করে নিয়ে যান এবং আজিমপুরের একটি বাসা থেকে তাকে উদ্ধার দেখিয়ে কিশোর ভিকটিম সেন্টারে পাঠানো হয়। এরপর ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আশকোনার একটি বাসা থেকে জেবুন্নাহারকে উদ্ধার দেখিয়ে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে আরও ১৬ দিন জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতনের পর তাঁকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেই তিনি জানতে পারেন, তাঁকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে।
জেবুন্নাহার জানান, চার বছর জেল খাটার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং দুই বছর জামিনে থাকেন। তবে তাঁর অভিযোগ, "ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার দুই বছর পর তাঁর জামিন বাতিল করে দেয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভয় ছিল, তিনি জামিনে থাকা অবস্থায় যদি তাঁর স্বামীর হত্যার বিচার চান—এই সন্দেহে তাঁর জামিন বাতিল করে দেয়।" ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট তাঁকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পতনের পর ৩১ আগস্ট জেবুন্নাহার পুনরায় জামিনে মুক্ত হন।