বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগের ঘোষণা দিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। প্রায় ১৮ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার লিজ চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৫টি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের বিমান থাকবে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বহরে যুক্ত হবে।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বনানীতে ‘বিয়ন্ড উইথ বোয়িং: পাওয়ারিং দ্য নেক্সট চ্যাপ্টার অব এভিয়েশন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, "একটি অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্স হিসেবে যাত্রা শুরু করে ইউএস-বাংলা আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা ও মানসম্মত সেবার প্রতি তাদের অঙ্গীকারই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।"

প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় ইউএস-বাংলার ২১টি নতুন বিমান সংযোজন একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বিমান চলাচল খাতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, "বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার এই চুক্তি কেবল একটি এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যটন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ বাড়বে এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।"

তিনি আরও জানান, ইউএস-বাংলার প্রায় ২০০ বাংলাদেশি পাইলটকে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়ক হবে।

বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগিহ বলেন, "আধুনিক ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী বোয়িং উড়োজাহাজ সংযোজনের মাধ্যমে ইউএস-বাংলা প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আস্থা এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।"

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এই বিনিয়োগকে দূরদর্শী বলে অভিহিত করে বলেন, "কোনো বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে এত বড় ও দূরদর্শী বিনিয়োগ করতে দেখে তিনি গর্বিত। এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থা এবং বিমান চলাচল খাতের সম্ভাবনারই প্রতিফলন।"

তিনি জানান, এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু ও টেকনিশিয়ানসহ দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউএস-বাংলা গ্রুপ ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, "বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথে প্রায় ৭০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্স বহন করছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে রাখা সম্ভব হবে।"

তিনি আরও বলেন, "ইউএস-বাংলার লক্ষ্য শুধু একটি সফল এয়ারলাইন্স পরিচালনা করা নয়, বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক এভিয়েশন গ্রুপে রূপান্তর করা। নতুন বহরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্গো, এমআরও (মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল), ফ্লাইট ক্যাটারিং, এভিয়েশন প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।"

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, নতুন বিমানগুলো যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট বাড়ানো হবে। এছাড়া বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কলম্বো, কাঠমান্ডু, জহুর বাহরু, পেনাং, কুনমিং, শেনজেন, বেইজিং, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কুয়েত, বাহরাইন, মদিনা, দাম্মাম ও সালালাসহ নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেখানে স্থায়ীভাবে বোয়িং উড়োজাহাজ মোতায়েন করে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ইউএস-বাংলা নিজস্ব অর্থায়নে পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক মানের একটি এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার এবং দেশে আধুনিক ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দূরপাল্লার গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্যে নতুন প্রজন্মের ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ সংযোজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।