শিল্পকারখানা, যানবাহন এবং জনবহুল এলাকার তীব্র শব্দদূষণে বিপর্যস্ত গাজীপুরবাসীকে স্বস্তি দিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। অপ্রয়োজনীয় হর্নের ব্যবহার বন্ধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে ‘নো হর্ন’ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

গত বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলনকক্ষে দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, “শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। কেবল প্রশাসনের একক উদ্যোগ নয়; বরং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গাজীপুরকে শব্দদূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

মতবিনিময় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি যানবাহনে ‘নো হর্ন’ কার্যক্রম চালু করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন, সব সরকারি যানবাহনে ‘সাইলেন্ট ড্রাইভিং’ স্টিকার সংযুক্ত করা এবং সরকারি দপ্তরের চালকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন বন্ধ করা এবং হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকাগুলোকে ‘সাইলেন্ট জোন’ হিসেবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল মিল ও ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও ভাড়াকৃত যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘স্মার্ট রাইডার’ সচেতনতামূলক কর্মসূচি, গণপরিবহন চালক ও মালিকদের নিয়ে সভা, সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণ এবং প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি হাইড্রোলিক ও অবৈধ উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণে বিশেষ অভিযান, নীরব এলাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, শব্দদূষণবিরোধী গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে কর্মপরিকল্পনায়।

সভায় বক্তারা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে জেলা প্রশাসন।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “১২ সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে গাজীপুরকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেশের একটি অনুসরণযোগ্য জেলায় পরিণত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।”