বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার মিরাজ শেখকে গুম করার বিষয়ে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। একটি প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের পর সংগঠনটি এই দাবি জানিয়েছে।
নিখোঁজ মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ এরই মধ্যে দিয়েছেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের এই নির্দেশ আসার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বাংলাদেশ সরকারকে ঘটনাটি তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
জানা গেছে, ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জয়মনির ঘোল এলাকার আল আমিনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে তাঁকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপর তাঁকে একটি স্পিডবোটে তোলা হয়, যেখানে পোশাক পরিহিত আরও সাত-আটজন কোস্টগার্ড সদস্য ছিলেন। ভুক্তভোগীর স্ত্রী দাবি করেছেন, তিনি হারবারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিজের চোখে তাঁর স্বামীকে কোস্টগার্ড সদস্যদের হেফাজতে দেখেছেন এবং পরে তাঁকে স্পিডবোটে করে নিয়ে যেতে দেখেছেন।
মিরাজ শেখের স্ত্রী আরও জানান, ঘটনার রাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নাজমুলের মাধ্যমে কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজ শেখকে নেওয়া হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা দিগরাজ কোস্টগার্ড অফিসে গেলে প্রথমে মিরাজকে ধরে নেওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়। তবে পরে দায়িত্বরত একজন সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে এলে দেখা করা যেতে পারে।
আসকের প্রতিনিধিদল গত ১৬ ও ১৭ মে দুই দিনব্যাপী সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে মিরাজের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, পুলিশ ও কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানতে পারেন, মিরাজ শেখকে তুলে নেওয়ার সময় তাঁর মোটরসাইকেলটি স্থানীয় চায়ের দোকানদার মো. আল আমিনের জিম্মায় রাখা হয়েছিল। ঘটনার ৮-১০ দিন পর গভীর রাতে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে মুখোশধারী দুই ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান।
এই বিষয়ে দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজে গিয়ে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে দেখা করলে তিনি মিরাজ শেখকে আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এমনকি পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়েছিলেন—এই বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন আসককে বলেন, "জয়মনির ঘোল এলাকা পূর্বে দুষ্কৃতকারীদের ঘাঁটি ছিল এবং সেখানে কোস্টগার্ডের কার্যক্রমে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ অভিযোগ তুলেছে।"
মিরাজের পরিবারের অভিযোগ, ১০ এপ্রিলের ঘটনার পর একাধিকবার থানায় গেলেও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণে পুলিশ অনীহা দেখায়। পরে ২৩ এপ্রিল কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ না করে একটি জিডি নথিভুক্ত করা হয়। পরিবারের দাবি, থানার নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিতে লেখা হয় যে মিরাজ শেখ নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন এবং কোস্টগার্ড কর্তৃক তাঁকে তুলে নেওয়ার অভিযোগটি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে দেওয়া হয়নি।
আসক মনে করছে, প্রাপ্ত তথ্য, ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারাবাহিক বক্তব্য এবং কোস্টগার্ডের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির মধ্যে বিদ্যমান স্পষ্ট অসংগতি একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সংগঠনটির তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁর অবস্থান অস্বীকার করা, পরিবারকে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত না করা কিংবা তাঁকে আইনানুগ সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন না করা বাংলাদেশের সংবিধানে নিশ্চিত জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জোরপূর্বক গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং জন–আস্থার সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।"
আসক অবিলম্বে মিরাজ শেখের অবস্থান নির্ণয়, পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।