মুক্তকণ্ঠের 'অন্য আলো' পাতায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এক সংকলন, যেখানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শন কাব্যিক ভাষায় ফুটে উঠেছে। এই রচনার মূল সুর আগামীর পথ খুঁজে পাওয়া এবং ভ্রমণের মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে চেনা।

সংকলনের প্রথম অংশে 'বিভোর পথিক' শিরোনামে কবির আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "তোমার চোখেতে তারাপথ খেলা করে
মনেতে সাজানো রঙিন ফানুস গলি
গান ধরে নাও হঠাৎ কেমন স্বরে...
নীরব থেকেও স্বপ্ন বপন করি।"

কবিতাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, "কী জানি কী করে এমন সজীব রেখো
এতটা দহন সহে ফেরা নীল মুখ...
পথে পথে চলো কুড়ায়ে অজানা সাঁকো
ভালোবাসা জানে মৌনতা কত সুখ।"

পথিকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কবি লিখেছেন, "বিভোর পথিক, থেমে যাও ভুলে আজ
ভবঘুরে দিন বাঁচিয়ে রেখো না যেন
থাক না শপথ—বাহানার শত বাজ
মনের বারণ মাদুলিতে হাসে কেন!"

'ছাতা' শিরোনামের অংশে রোদ, বৃষ্টি এবং ভ্রমণের আদি মোড়ের কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, "আমাদের রোদ আজ ছাতা ভুলে ফেলে গেছে দূরে।
চোখে তার বায়স্কোপি গান।"

কবিতার এই অংশে আরও লেখা হয়েছে, "ঠোঁটে লেগে আছে কার হোমারের সংগ্রহের বুলি?
ঘাটশিলার চোখ বেয়ে নামচে ভ্রমণের আদি মোড়!"

প্রকৃতি ও অনুভূতির সংমিশ্রণে কবি বর্ণনা করেছেন, "দোনাভরা স্বপ্ন নিয়ে মৃণ্ময়ী দেহদানের ঘোর
শেষ শেষ করে থামে;
কিন্তু প্রতীক্ষার গোঁফ টেনে আরও মূলে করে স্থিতি।"

নাভিমূল ও ঈশানী হাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, "নাভিমূল জানে ঝড় আসা ইশারার নোনাবেগ।"

"ঈশানী হাওয়ায় শিখে
ফুলডুংরির রোদমাখা আদর।"

বর্ষণ ও তৃপ্তির কথা বলে কবি লিখেছেন, "বর্ষণ যদিও রুক্ষ হয়, তবু পরিচয় তার
তৃপ্তিতেই জেগে থাকে।"

রোদ ও মেঘের বনিবনা নিয়ে বলা হয়েছে, "আমাদের রোদ ছাতা ফেলে কত জেনে গেছে;
মধুমাখা স্থিতি আর দেহমেঘের কী বনিবনা..."

'সঞ্চয়' শিরোনামের অংশে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "হাত শুধু পাতা ছুঁয়ে ভেবে আছে ফুল"

"মেঘ দাগ টেনে নিজেকে করেছে কূল"

"চোখ খুঁজে রেখে দেয় ছড়ানো পালক"

"রোদ পারাবার গিলে নেমে গেছে দেহে"

"কোনো অজুহাত মানে না রসালো সন্ধ্যা"

আলো ও মাস্তুলের রূপক ব্যবহার করে লেখা হয়েছে, "পাতার পিঠেই জ্বলে আজ শিশু আলো"

"বারণে মাস্তুল নামে নধরের মূলে"

"অকারণ ভুলে গেঁথে যায় দেহবাণ"

ভ্রমণের সঞ্চয় নিয়ে কবির চূড়ান্ত উপলব্ধি হলো, "ভ্রমণে সঞ্চয় থাক গিরিখাতে জমা
আগামীর পথ হলো ভ্রমণে রচনা।"

'মোহ' শিরোনামের অংশে আভিজাত্য ও ইচ্ছামোহের কথা বলা হয়েছে। কবি লিখেছেন, "আভিজাত্যের দেরাজ
খুঁজতে খুঁজতে আমি অতিক্রম করি ইচ্ছামোহ।"

সংসার ও সন্ন্যাসের রূপক টেনে বলা হয়েছে, "যে গ্রহের ছায়াবনে খুদকুঁড়ো ছিটিয়ে
সাজিয়েছি হরিণী সংসার
এখন সেখানে চলে বেজির সন্ন্যাস পালা।"

প্রকৃতির বৈভব নিয়ে কবি লিখেছেন, "নাগপুত্র, শুনো,
ফণীমনসার প্রতিযোগ বৈভব মানে না,
বিস্তৃত উইয়ের ঢিবি জানে
প্রাচুর্য কখনো দিকপাল হতেই পারে না।"

সময় ও আকাশের সম্পর্ক নিয়ে বলা হয়েছে, "সময় পিতার মতো আকাশকে শাসিয়ে রাখে যেন"

"জলের সংলাপ চিরস্থায়ী বৃত্তান্ত প্রকাশ করে।"

শব্দ ও কবির ঋণ নিয়ে লেখা হয়েছে, "রাতভাষ্যে তীব্র হয় দেহগানের ঋষভ,

শব্দমোহে বেড়ে যায় কবিজন্মের ঋণ।"

সবশেষে 'যুগল' শিরোনামের অংশে বিচ্ছেদ ও মিলনের এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "বিবাদী দেয়াল মাথা নিচু করে আছে।"

"সুড়ঙ্গ ধুয়েছে মন।"

"ভ্রমণে পরিত্যক্ত মাস্তুল।"

"শ্বাসের পাহারা দেয় ঠোঁট।"

দূরত্বের কথা বলে কবি লিখেছেন, "নাড়ির অচিন গতি পেরিয়ে আরও দূরের পথ,
এঁকে যায় মধ্যমান
সন্ধানী পারদ।"

সুখ ও ভবিতব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলা হয়েছে, "তবুও ভষ্মের কাছে প্রশ্ন রাখে সুখ: যা পেলাম তা কী করে হয়েছে অক্ষয়?"

"সূত্রের মতন টেনে নিয়ে যাবে সুচারু ভবিতব্যের দিকে।"

সত্যের ছাপ ও ধারণার কথা বলে কবি লিখেছেন, "এভাবেই বুঝি চিহ্নিত সত্যের ছাপ বেড়ে ওঠে দিনে দিনে...
আর তুমি বেঁচে থাকো ধারণের মাঝে।"

কবিতার সমাপ্তি ঘটেছে এক অনন্ত মিলনের আকাঙ্ক্ষায়: "আমাদের বহুকাল এক হয়ে যায়
সিঁড়ির অন্তিম স্রোতে।"