• জামালপুরের সাত উপজেলায় সরকারি বরাদ্দে ৫৩৮টি স্থানীয় উন্নয়নকাজে (প্রকল্প হিসেবেও পরিচিত) অনিয়ম।

  • ৪২টি স্থানীয় উন্নয়নকাজের (প্রকল্প) অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৩৮টি প্রকল্পে আংশিক কাজ হয়েছে, তবে বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

.

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় ‘শিশু যত্ন বিদ্যালয়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। হিসাবটা এ রকম—অবকাঠামো উন্নয়নে দুই লাখ, বাকি টাকা ব্যয় হবে আসবাব ও খেলনাসামগ্রী কিনতে।

কাগজে–কলমে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শিশু যত্ন বিদ্যালয় নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি মুক্তকণ্ঠ। পরে বকশীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। তারা বলছে, ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বকশীগঞ্জে নেই।

.
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপির আওতায় জামালপুরে বরাদ্দ ছিল ২২ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।
.

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে ওই বরাদ্দ দিয়েছিল বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। আর কাজটি ‘সম্পন্ন’ করা হয়েছিল প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে। দরপত্র ছাড়াই সংশ্লিষ্ট এলাকার উপকারভোগী বা স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিয়ে অবকাঠামোসহ ছোটখাটো কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়, যা পিআইসি নামে পরিচিত। সাধারণত পিআইসির মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করা হয় না। জেলা–উপজেলা পর্যায়ে ছোটখাটো উন্নয়নকাজে স্থানীয় সরকারের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকেও বরাদ্দ দেওয়া হয়।

.

পিআইসির আওতায় অস্তিত্বহীন বিদ্যালয়ে যখন চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তখন বকশীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন মাসুদ রানা। তিনি এখন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। বকশীগঞ্জের ইউএনও থাকার সময় অস্তিত্বহীন বিদ্যালয়ে বরাদ্দের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে ৬ জুলাই মুঠোফোনে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা, ওই বিদ্যালয় গড়ে তোলার চিন্তা থেকে ওই নামে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি সম্ভব না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ওই টাকায় বিভিন্ন ক্রীড়াসামগ্রী কিনেছিলাম আমি নিজে। সেগুলো আমি অন্যান্য বিদ্যালয়ে বিতরণ করেছি।’

সংশ্লিষ্ট পিআইসির নিয়ম অনুযায়ী আসবাব ও খেলনাসামগ্রী ইউএনও কিনতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নে মাসুদ রানা বলেন, ‘কেনার সময় আমাকে পণ্যগুলো দেখানো হয়েছিল, এটাই বলতে চেয়েছি।’

.
জামালপুরে যে ৫৩৮টি উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০টির এখন কী অবস্থা, তা সরেজমিনে দেখেছেন মুক্তকণ্ঠর এই প্রতিবেদক।
.

জামালপুরের সাতটি উপজেলায় (সদর, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী) এডিপির আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বরাদ্দের বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে ৫৩৮টি উন্নয়নকাজ (সরকারি বরাদ্দে কোথাও কোনো উন্নয়নকাজ হলে তা ‘প্রকল্প’ হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পায়) নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৫৯টি উন্নয়নকাজ দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। বাকি ২৭৯টি উন্নয়নকাজ দরপত্র ছাড়াই পিআইসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন। এসব উন্নয়নকাজের তদারকিতে ছিল স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় এসব উন্নয়নকাজ ‘বাস্তবায়ন’ করা হয়।

.

জামালপুরে যে ৫৩৮টি উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০টির এখন কী অবস্থা, তা সরেজমিনে দেখেছেন মুক্তকণ্ঠর এই প্রতিবেদক। সরেজমিনের কাজটি করা হয়েছে গত ১৫ মে থেকে ৩০ জুনের মধ্যে। মোট উন্নয়নকাজ বা প্রকল্পের প্রায় ১৫ শতাংশের কী অবস্থা, তা যাচাই করে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। যেসব উন্নয়নকাজের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে মুক্তকণ্ঠ, সেখানে সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কোনোটির কাজ হয়েছে পিআইসির মাধ্যমে, আর কোনোটি দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারকে দিয়ে।

মুক্তকণ্ঠর সরেজমিন ও অনুসন্ধানে ৪২টি উন্নয়নকাজের (প্রকল্প) অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর ৩৮টি উন্নয়নকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ করা হয়নি। কোথাও কাজ হয়েছে আংশিক, কোথাও অর্ধেক, কোথাও কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। কিন্তু কাগজে–কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দের পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

জামালপুরের সাত উপজেলায় সরকারি বরাদ্দের টাকায় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের সময় যাঁরা ইউএনওর দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সবাইকে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর একসঙ্গে বদলি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো অনিয়ম হয়নি বলে তাঁরা দাবি করেছেন। আরও বলেছেন, উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের বিষয়টি তদারক করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলীরা।

এ বিষয়ে জামালপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উন্নয়নকাজের বরাদ্দ সরাসরি উপজেলা পরিষদে আসে। বরাদ্দের বিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউএনওরা সব কাজ করেন। এলজিইডির প্রকৌশলীরা শুধু তদারক ও সহযোগিতা করেন। এরপরও যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, তাহলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

.

বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ কিলোমিটার দূরে চরবাণিপাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়। এই ইউপি কার্যালয়ে কম্পিউটার সরবরাহের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। দরপত্র ছাড়াই পিআইসির মাধ্যমে কাজটি করে স্থানীয় প্রশাসন।

পিআইসির এই প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন চরবাণিপাকুরিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলাল উদ্দিন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। উপজেলা পরিষদে নিয়ে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। এর বেশি কিছুই জানি না।’

একই ইউনিয়ন কার্যালয়ের তিনটি কক্ষ মেরামত ও রং করার জন্য বরাদ্দ ছিল দুই লাখ টাকা। সেখানে গিয়ে রং বা মেরামতের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

রঙের কাজ হয়েছিল কি না, তা জানতে চরবাণিপাকুরিয়া ইউপির তিনজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা বলেছেন, এ রকম কোনো কাজ হয়নি।

মেলান্দহ উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে আদ্রা ইউনিয়নের থুরী এম এ রশিদ হাফেজিয়া মাদ্রাসা রাস্তা উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেখানে গিয়ে ইটের বা মাটির কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে কথা হয় মাদ্রাসার সুপার মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসা পাকা সড়কের মোড়ে। মাদ্রাসায় ঢোকার আলাদা কোনো রাস্তা নেই। যে কারণে মাদ্রাসার রাস্তা উন্নয়নের কোনো সুযোগও নেই। এ রকম প্রকল্পের কোনো খবরও আমাদের কাছে নেই।’

.

এই তিন উন্নয়নকাজের বিষয়ে মেলান্দহের তৎকালীন ইউএনও এস এম আলমগীরের সঙ্গে গত ৮ জুন মুঠোফোনে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি দাবি করেন, কাজের ছবি ও ভিডিও দেখে বরাদ্দের টাকা দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়নকাজের এলাকা পরিদর্শন করেছেন কি না—এমন প্রশ্নে এস এম আলমগীর বলেন, ‘অনেক কাজের মধ্যে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য চেয়ার, টেবিল ও কম্পিউটার কিনতে সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে; কিন্তু অনুসন্ধানে সরঞ্জাম সরবরাহের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মাদারগঞ্জ উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা এম ই সরোয়ার বলেন, ‘২০২৫ সালের অক্টোবরে আমি এখানে যোগদান করেছি। আমি আসার পর এ ধরনের কোনো বরাদ্দ পাইনি। যদি কাজ হয়েও থাকত, নিশ্চয় আমি দেখতে পেতাম।’

এম ই সরোয়ারের আগে মাদারগঞ্জ উপজেলায় আইসিটি কর্মকর্তা ছিলেন নুর আলম। তাঁর সঙ্গে জুন মাসে মুঠোফোনে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি বলেন, ‘আমাকে ওই সময়ে চারটি কম্পিউটার কেনার টাকা দেওয়া হয়েছিল। টাকার পরিমাণ এ মুহূর্তে মনে নেই। তবে আমি চারটি কম্পিউটার কিনে বালিজুড়ী রওশন আরা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দিয়েছিলাম।’ এ প্রকল্প তো একটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়ন করার কথা ছিল—এমন প্রশ্নে বলেন, সেটা তিনি জানেন না।

চেয়ার–টেবিলসহ কম্পিউটার কেনার প্রকল্পটি যখন বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তখন মাদারগঞ্জের ইউএনও ছিলেন নাদির শাহ। এ বিষয়ে ৭ জুন মুঠোফোনে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের নামটি হয়তো ঠিক নেই। তবে বালিজুড়ী রওশন আরা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ওই সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল।

.

কিন্তু এই বিদ্যালয়ের নাম প্রকল্পের তালিকায় নেই—এমন প্রশ্ন করা হলে নাদির শাহ কোনো উত্তর দেননি।

বালিজুড়ী রওশন আরা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নয়ন চন্দ্র বসাক বলেন, ‘উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ছয়টি চেয়ার ও চারটি টেবিল দেওয়া হয়েছিল। এগুলোর দাম কত এবং কোন প্রকল্পের, সেটা আমরা জানি না। এ–সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও দেওয়া হয়নি।’

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী ইউনিয়নের মামুন ডাক্তারের বাড়ি থেকে আবেলের বাড়ি পর্যন্ত জিও ব্যাগ ফেলে রাস্তা ও নদীর বাঁধ মেরামতের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চিনাডুলী ইউপির এক সদস্য বলেন, সেখানে অন্য একটি প্রকল্পের জিও ব্যাগের কাজ আগেই করা ছিল। সেটিকেই হয়তো নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এ কাজের জন্য গঠিত পিআইসির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম। তিনি বলেন, ‘কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছি।’ সেখানে অন্য একটি প্রকল্পের মাধ্যমে জিও ব্যাগের কাজ হয়েছিল মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছিল। সেটাই মেরামত করা হয়েছিল।’

একই উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দরিদ্রদের মধ্যে স্যানিটারি ল্যাট্রিন সরবরাহে পিআইসি কমিটির মাধ্যমে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই পিআইসির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. কাশেম মোল্লা বলেন, ‘আমাকে যে প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে, এটা আপনার কাছ থেকেই শুনতেছি।’

.

এ বিষয়ে ৮ জুন ইসলামপুরের তৎকালীন ইউএনও মো. তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ তদারক করেছেন প্রকৌশলীরা। তাঁরা প্রত্যয়ন দেওয়ার পর টাকা ছাড় করা হয়েছে। কোথাও অনিয়ম হলে প্রকৌশলীদের দায় নিতে হবে।

দেওয়ানগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন মেরামত, ইসলামপুর উপজেলা পরিষদের অফিসার্স ক্লাব সংস্কার, সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নে পুকুরপাড়ের প্যালাসাইডিং নির্মাণসহ অন্তত ৩০টি অস্তিত্বহীন প্রকল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বে আছেন সাবেক কমান্ডার দুলাল তালুকদার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সংস্কারের কোনো কাজ হয়নি। কোনো বরাদ্দও পাওয়া যায়নি। আপনার কাছেই শুনলাম, বরাদ্দ ছিল।’

এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জের তৎকালীন ইউএনও মো. আতাউর রহমান ৮ জুন মুঠোফোনে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাজ দুটি সম্ভবত আমার সময়ে ছিল না। এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই।’

.

আংশিক কাজ করে অর্থ উত্তোলন

জামালপুর সদর উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফাপাড়া ঈদগাহ মাঠের নিরাপত্তাদেয়াল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। মাঠের চারপাশে দেয়াল নির্মাণ করার কথা ছিল। সরেজমিন দেখা যায়, মাঠের উত্তর ও পূর্ব পাশের একটি অংশে দেয়াল নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে টিন দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের পুরো টাকাই ব্যয় দেখানো হয়েছে।

সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের চরশী উত্তর কান্দিরপাড়া জামে মসজিদের উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল এক লাখ টাকা। মসজিদ কমিটির সভাপতি আমির উদ্দিন বলেন, ৬০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে।

প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোসলেম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই মসজিদে ৭০ হাজার টাকার টাইলস লাগিয়ে দিয়েছি।’ মসজিদ কমিটির সভাপতির বক্তব্য জানানো হলে তিনি বলেন, ‘উনি ভুল বলেছেন।’

বিভিন্ন প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে জামালপুর সদর উপজেলার তৎকালীন ইউএনও জিন্নাত শহীদ ৬ জুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কিছু অসংগতি ছিল। তবে চেষ্টা করা হয়েছে প্রকল্পের কাজগুলো যাতে সঠিকভাবে হয়। দ্রুত কাজ করতে ভেঙে ভেঙে একাধিক ছোট প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।

.

পিআইসির সভাপতিরা প্রকল্পের ব্যাপারে ভালোভাবে জানেন না—এমন প্রশ্নে জিন্নাত শহীদ বলেন, তাঁরা সঠিক বলেননি। জেনেবুঝেই স্বাক্ষর করে তাঁরা প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করেছেন।

মাদারগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নিরাপত্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নথিতে দরপত্রপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘তৎকালীন ইউএনও নাদির শাহ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে আড়াই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকায় আমরা ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছি। বাকি টাকার বিষয়ে জানি না।’

বর্তমানে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট বলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে।

ইসলামপুর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গাড়ি রাখার জায়গা (প্রকল্পে গ্যারেজ উল্লেখ করা আছে) নির্মাণের জন্য আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে দেখা যায়, খোলা একটি জায়গার ( দৈর্ঘ্যে ৪২ ফুট, প্রস্থে ১৮ ফুট) তিন পাশে আড়াই ফুট উঁচু ইটের দেয়াল তুলে এর ওপর লোহার কয়েকটি খুঁটি বসানো হয়েছে। সেসব খুঁটির ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি গাড়ি (কার) রাখার ব্যবস্থা আছে। এ কাজে ব্যয় দেখানো হয়েছে আট লাখ টাকা।

.

বরাদ্দের কথা জানেন না প্রধান শিক্ষক

জামালপুর সদর উপজেলায় শিক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল ৫৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ টাকায় ১৫টি ইউনিয়নে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসহায়তা সামগ্রী ও বিভিন্ন সরঞ্জাম বিতরণ, নারীদের সেলাই মেশিন বিতরণ ও প্রশিক্ষণ, শোভাযাত্রা, কুইজ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মশালা করার কথা বলা হয়েছে।

এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে জামালপুর সদর উপজেলার ৪৮টি বিদ্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে ১১টি বিদ্যালয় কিছু উপকরণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। কোথাও একটি ফুটবল অথবা কয়েক জোড়া বেঞ্চ, কোথাও একটি ফ্যান, কয়েকটি টেবিল ও কিছু স্কুলড্রেস দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৫টি বিদ্যালয় কোনো বরাদ্দই পায়নি।

সদর উপজেলার জোকা ভারুয়াখালী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ রশিদ বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরের মধ্যে উপজেলা পরিষদের এক টাকারও অনুদান পাইনি। আপনার মুখ থেকেই জানতে পারলাম, এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে এত কিছু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

একই কথা বলেছেন সদর উপজেলার আলিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুল্লাহও। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের জন্য যে এত কিছু বরাদ্দ ছিল—সেটা আপনার কাছ থেকেই জানতে পারলাম। বরাদ্দের কিছুই পাইনি।’

.

প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ

জামালপুরের সাত জেলায় সরকারি বরাদ্দের বেশির ভাগ উন্নয়নকাজ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাস্তবায়ন করা হয়। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকে পলাতক ছিলেন। তখন স্থানীয় প্রশাসনে কার্যত শূন্যতা তৈরি হয়। তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বল পরিবেশে ইউএনওদের একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।

অভিযোগ আছে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৎকালীন ইউএনও ও এলজিইডি কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দমতো উন্নয়নকাজের তালিকা করেন। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামালপুরের অন্তত পাঁচজন ইউপি চেয়ারম্যান দাবি করেন, জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে উপজেলা প্রশাসনের হাতে কার্যত একক কর্তৃত্ব চলে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ইউপি সদস্য ও ইউপি সচিবদের সঙ্গে যোগসাজশে কাগজে–কলমে উন্নয়নকাজ দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে ও তদারকি দুর্বল হলে অনিয়ম হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় হলো কি না, তার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ৫ আগস্টের (২০২৪ সাল) পর ইউএনওদের কাছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। স্থানীয় উন্নয়ন বরাদ্দে নানা ধরনের অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে। অনিয়মের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।