আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে এই আমন্ত্রণ জানানো হলেও, বাংলাদেশ এতে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র গত সোমবার মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন ও মালদ্বীপ সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় ফিরেছেন।
২৩ জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, "ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর নামে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে এবং সেটি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।"
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, ১৪ জুলাই ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। উল্লেখ্য, ব্রিকস উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট এবং বিমসটেক বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা জোট।
ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে সাধারণত সদস্য নয় এমন নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১ দেশ ব্রিকসের সদস্য।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এই অংশগ্রহণ কেবল একটি বহুপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকার বিষয় নয়। বাংলাদেশ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে এবং চীন ও রাশিয়া এই সদস্যপদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এছাড়া বর্তমান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস আউটরিচে অংশ নিলেও ২০২৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত পর্বে অংশ নেয়নি। দিল্লির সূত্রমতে, এবারের সম্মেলনে অধিকাংশ সদস্য দেশের শীর্ষ নেতা উপস্থিত থাকবেন, ফলে চীন ও রাশিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের সুযোগও তৈরি করতে পারে। বহুপক্ষীয় এই ফোরামের সুযোগ বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত।"
আমন্ত্রণপত্রে নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেছেন, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ’। এতে জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং ‘মানবতাই সবার আগে’ নীতির আলোকে সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। মোদি আশা প্রকাশ করেছেন যে, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং তিনি সম্মেলনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, "বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসবে, প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু হয়েছে বলেও তাঁর জানা নেই।"
তবে সাবেক ও বর্তমান জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। সীমান্তে ভারতের পুশ-ইন চেষ্টা, ভারতীয় নেতাদের মন্তব্য এবং রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার ইচ্ছার কথা বলায় সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে গতি তৈরি হয়েছে, নির্বাচনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনমতের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তাঁর মতে, এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।"