আগামী আগস্ট মাসেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের অপেক্ষা না করে আগস্টের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহেই এই নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

এদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। এর আগে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম আলোচনায় থাকলেও, বর্তমানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দলের ভেতরে ও বাইরে তাঁকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গত শনিবার বগুড়ায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, "রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় নাকি বাইরের কাউকে প্রার্থী করা হবে, সে সিদ্ধান্ত সংবিধান ও আইন অনুযায়ী বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই নেওয়া হবে।"

এর আগে দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নিয়মিত বা বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকা বাধ্যতামূলক নয়; পৃথক ব্যবস্থায়ও এই নির্বাচন করা সম্ভব। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান শনিবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন হবে না।"

উল্লেখ্য, ১৫ জুলাই সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসবে। সেই অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন আইনমন্ত্রী।

গত ২৪ জুলাই শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলোর মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিষয়টি স্থায়ী কমিটির আলোচনার মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হবে। তবে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন।

দলীয় সূত্র বলছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, কঠিন সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং দলীয় গণ্ডির বাইরে গ্রহণযোগ্যতার কারণে মির্জা ফখরুল সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় এগিয়ে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদের উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন।

তবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়তে হবে এবং বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব আনতে হবে। এছাড়া সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলে তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হবে, ফলে ওই আসনে উপনির্বাচন প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছে। গতকাল সংসদ ভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে, তবে চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সিইসি আরও জানান, সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ সদস্যদের ভোটার তালিকা পাওয়ার পর তফসিল ঘোষণা করা হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট হবে এবং একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। ওই বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও তাহমিদা আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।