বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন এবং এর অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ঘিরে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনা থেকে সরে না এলে স্পেন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো বিশ্বকাপ বয়কটের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের ক্রীড়া সংবাদদাতা রব হ্যারিস এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছেন। একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার বিরোধিতায় উয়েফার সদস্য দেশগুলো চলতি সপ্তাহেই একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে বসবে, যেখানে বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো ইউরোপীয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং কোন দেশগুলো এই পদক্ষেপের পক্ষে, তা স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তবে ইনফান্তিনো পিছু না হটলে তাকে চাপে ফেলতে বয়কটের হুমকিকে ইউরোপের চূড়ান্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছে ওই সংবাদমাধ্যমটি।

মঙ্গলবার ফিফা নিশ্চিত করেছে যে, তাদের বাণিজ্যিক ও প্রতিযোগিতা পরিচালনার কার্যক্রম এক ছাতার নিচে আনতে 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০ বিলিয়ন ডলার প্রাথমিক মূল্যের এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অংশ বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে চায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে ফিফার দাবি, বাইরের বিনিয়োগকারীরা কেবল সংখ্যালঘু অংশের মালিক হবেন; ফুটবল, প্রতিযোগিতা, ম্যাচ সূচি এবং খেলাসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তের একক নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকবে।

পরিকল্পনাটি প্রকাশের পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে উয়েফা। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, “ফুটবলের আত্মা ও শাসনব্যবস্থা কেনাবেচার সম্পদ নয়। ফুটবলের মালিক আমরা কেউ নই। এটি বিক্রি করার অধিকার ফিফার নেই।”

উয়েফার মতে, আর্থিকভাবে কারা লাভবান হবে সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা ছাড়াই এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাই জাতীয় ফুটবল সংস্থা ছাড়াও ক্লাব, লিগ, খেলোয়াড়, সমর্থক ও সরকারগুলোর উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।

স্কাই নিউজ জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও মঙ্গলবারের আগে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত না। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের ফুটবল কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফিফার বৈঠক হলেও সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি।

ফিফা জানিয়েছে, প্রস্তাবটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং ২১১ সদস্য ও ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া এটি কার্যকর হবে না। নতুন বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত অর্থ বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি সদস্য দেশ উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বর্তমানে ৮০ লাখ ডলারের পরিবর্তে দুই কোটি ডলার পর্যন্ত পেতে পারে। ইনফান্তিনোর ভাষায়, এই পরিকল্পনাটি “বিশ্ব ফুটবলের গণতন্ত্রীকরণের” অংশ।

তবে ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে উয়েফার সদস্য মাত্র ৫৫টি হওয়ায় ভোটে ইউরোপের বিরোধিতা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও প্রতিযোগিতামূলক সাফল্যে ইউরোপীয় দলগুলোর গুরুত্বের কারণে তাদের সম্মিলিত বয়কটের হুমকি ফিফার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

এর আগে দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও একই কৌশল ব্যবহার করেছিল উয়েফা। ২০২১ সালে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন জানিয়ে দিয়েছিলেন, এমন বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দেশগুলো অংশ নেবে না। প্রবল বিরোধিতার মুখে পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে ফিফা।

সম্ভাব্য বয়কট কোন আসরকে লক্ষ্য করে হতে পারে, তা স্পষ্ট করেনি স্কাই নিউজ। আগামী বছর ব্রাজিলে নারী বিশ্বকাপ এবং ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয় পুরুষ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।