একটি গ্রামের নাম কেবল পরিচয়ের মাধ্যম নয়, বরং অনেক সময় তা বহন করে শত বছরের ইতিহাস, লোককথা ও জনজীবনের স্মৃতি। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী গ্রাম বালাকান্দি তেমনই একটি জনপদ। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় ভয়াবহ রোগবালাইয়ের কারণে বিপর্যস্ত ছিল পুরো এলাকা। সেই সময়ের স্মৃতিকেই ধারণ করে গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘বালাকান্দি’।
গত মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে এই নামের রহস্য জানা যায়। বর্তমানের শান্ত, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বালাকান্দিকে দেখে অতীতের সেই দুর্বিষহ সময়ের কথা কল্পনা করা কঠিন। তবে কয়েক প্রজন্ম আগে এই গ্রামে জ্বর, আমাশয় ও পেটের নানা রোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি নিয়মিতভাবে ছড়িয়ে পড়ত। চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা যতিন বালা (৭৮) বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় বড়দের কাছ থেকে শুনেছি, এলাকার মানুষ প্রায়ই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতো। তখন তেমন চিকিৎসা ছিল না। সেই কারণেই বাপ-দাদারা গ্রামের নাম বালাকান্দি রাখেন। এখন সময় বদলেছে, কিন্তু নামটি সেই ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
আলিনগর ইউনিয়নের সমাজসেবী শাহিন মোল্লা বলেন, “গ্রামের নাম শুধু একটি শব্দ নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বালাকান্দির নামের পেছনের ইতিহাস সংরক্ষণ করা দরকার। কারণ, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনসংগ্রামের একটি নীরব দলিল।”
গৃহিণী রিতা রানি মন্ডল জানান, বর্তমানে গ্রামে আগের মতো রোগবালাই নেই। মানুষ সচেতন হয়েছে এবং চিকিৎসার সুযোগও বেড়েছে। তবে গ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই নাম রাখা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। স্থানীয় শিক্ষাবিদ অসিম মন্ডল জানান, এ ধরনের নামকরণের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে বর্তমানে বালাকান্দিতে রোগের প্রকোপ কমেছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, স্বাস্থ্যসচেতনতা, টিকাদান কর্মসূচি এবং চিকিৎসাসেবার প্রসারের কারণে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে গ্রামের নামটি এখনও অতীতের সেই কঠিন সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
আলিনগর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার নান্নু মোল্লা মুক্তকণ্ঠকে জানান, “মূলত রোগ বালাই বেশি হওয়ায় এলাকার নাম এরকম রাখা হয়েছিল। আমি আমার পূর্বপুরুষের কাছে শুনেছি একসময় এলাকার নাম ছিল সস্তাল, পরে এই এলাকার নাম রাখা হয়েছে বালাকান্দি। একটি একটি জনবহুল এলাকা, আমরা চাই এলাকায় একটু সরকার নজর এবং উন্নয়ন হোক।”
ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও জনজীবনের বাস্তবতার এক অনন্য মেলবন্ধন বালাকান্দিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও গ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এখানকার মানুষ। একটি নাম যে পুরো জনপদের ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে, মাদারীপুরের বালাকান্দি তারই এক অনন্য উদাহরণ।