সাভারের ধামসোনা নলাই মুকেন্দ্র হাউজ থেকে কারিগরপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত নবনির্মিত এক কিলোমিটার সড়ক ও ব্রিজের সংযোগস্থল ধসে পড়েছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে নির্মাণ কাজ চলার পর উদ্বোধনের আগেই এই বিপর্যয় ঘটে। জাইকার অর্থায়নে নির্মিত এই প্রকল্পে চরম নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ধামসোনা ইউনিয়নের নলাই মুকেন্দ্র হাউস থেকে কারিগরপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত এইচবিবি উন্নয়ন এবং তিনটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছিল সালেহ এন্টারপ্রাইজ। ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়ক নির্মাণে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঢালাইয়ে সিমেন্টের পরিমাণ ছিল অপ্রতুল। স্থায়ী গাইডওয়ালের পরিবর্তে বাঁশের চাঁটাই, কাঠের বেড়া ও মাটি দিয়ে অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও প্লাস্টিকের বস্তায় বালু ও মাটি ভরে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও তা ইতোমধ্যে সরে গেছে। এছাড়া ব্রিজের দুই পাশে কংক্রিটের স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেয়ালের পরিবর্তে শুধু মাটি ভরাট করায় মাত্র দুদিনের মধ্যেই সংযোগস্থল ধসে পড়ে। যেসব স্থানে কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর অনেক অংশ বাঁকা হয়ে আছে এবং কিছু অংশ ভেঙে নিচে পড়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট সাশ্রয় করতে সড়কের বিভিন্ন অংশে ফাঁকা রেখে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এমনকি নদীতীর সংরক্ষণে বসানো ব্লকগুলোর মাঝেও সিমেন্টের বদলে বালু ও মাটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিজের গোড়ায় বড় কংক্রিট ব্লক দিয়ে নদীতীর সংরক্ষণের কথা ছিল। কিন্তু সেখানে বাঁশ ও কাঠের বেড়া দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। দুদিনের মধ্যেই সব ধসে নদীতে চলে গেছে। ভারী যানবাহন চলাচল শুরু হলে পুরো সড়ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজের অনিয়মের বিষয়ে আমরা বারবার অভিযোগ করলেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি।’
কসাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিঠু বলেন, ‘চার বছর ধরে এই সড়কের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অথচ নির্মাণ শেষে দেখা গেল নিম্নমানের ইট, বালু ও মাটি দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। সরকারি চার কোটি টাকা অপচয় করে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। আমরা দায়ীদের শাস্তি ও টেকসইভাবে সড়ক পুনর্নির্মাণের দাবি জানাই।’
এই অভিযোগের বিষয়ে সালেহ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম সুমন জানান, ‘আমি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলাম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কাজ শুরু করলেও নানা প্রতিকূলতা ও অসহযোগিতার কারণে সময়মতো শেষ করতে পারিনি। বিষয়টির পেছনে বিস্তারিত কারণ রয়েছে, যা সামনাসামনি বলতে চাই।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফাইজুল ইসলাম বলেন, ‘জাইকার অর্থায়নে প্রায় চার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে আমরাও অসন্তুষ্ট। পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে ঠিকাদারকে সব ত্রুটি দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী টেকসই গাইডওয়াল ও প্রতিরক্ষা ব্লক নির্মাণ না করা পর্যন্ত ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল দেওয়া হবে না। নির্ধারিত মান নিশ্চিত না হলে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’