গ্রাফিক ডিজাইনকে কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনে সীমিত না রেখে সৃজনশীলতার নতুন দিক উন্মোচনের প্রয়াস দেখা গেল শিল্পী মাহবুবুর রহমানের পরিচালনা ও কিউরেটিংয়ে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের আয়োজনে ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ বা ‘নির্দেশনার বাইরে’ নামে ১০ জন শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনীতে।
আয়োজনস্থল বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়। অংশগ্রহণকারী ১০ জন হলেন মাহবুবুর রহমান, ইমরান হোসেন পিপলু, মনির মৃত্তিক, আলী সাগর, শেখর শাশ্বত, পীযূষ তালুকদার পিন্টু, সনৎ কুমার বিশ্বাস, মিতা মেহেদী, মেহেদী হাসান ও শিমুল দত্ত।
কিউরেটর শিল্পী নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন—কিউরেটিং নোটে তিনি উল্লেখ করেন—‘শিল্পের ইতিহাসে আধুনিকতাবাদ (মডার্নিজম), কিউবিজম এবং দাদা আন্দোলন গ্রাফিক ডিজাইনের বিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধের পক্ষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আমেরিকার প্রপাগান্ডা পোস্টার এর বড় উদাহরণ। শিল্পবিপ্লবের যুগে মূলত রুশ গঠনবাদ (কনস্ট্রাক্টিভিজম) আন্দোলনের প্রভাবে আকার ও গঠনশৈলীর শক্তি প্রতীয়মান হয়। এর ধারাবাহিকতা জুরিখের পোস্টার ও সাইনবোর্ডে এখনো দৃশ্যমান। পোস্টারগুলো একেকটি অনন্য চিত্রকর্ম মনে হয়। ২০২৫ সালে জুরিখ সফরে দাদা আন্দোলনের সূতিকাগার ‘ক্যাবারে ভলতেয়ার’ ও ‘কুনস্তহাউস জুরিখ’-এর সংগ্রহ, বিশেষ করে পোস্টার দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই।’
কিউরেটর মাহবুব ও তাঁর সঙ্গীরা দেশে এই ধরনের আয়োজনের চিন্তা করেন। ‘নির্দেশনার বাইরে’ শীর্ষক ভিন্নধারার প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ১৮ জুলাই।
কাচের দরজার ডান দিকে কিউরেটিং নোট রাখা আছে। এর পরের দেয়ালে তরুণ শিল্পী শেখর সাখাওয়াতের তিনটি কাজ—‘আ ট্রিবিউট টু দ্য আলটিমেট’, ‘গ্রাটিচুড’ ও ‘পারসেপশন অব দ্য আলটিমেট’—উপস্থাপিত হয়েছে। চুল দিয়ে সূচিকর্মের সঙ্গে সাদা সূচিনকশা করা পটের ওপর ততোধিক সাদা রঙের ওই লেখাগুলো ঐতিহ্যের পরিচ্ছন্ন সুন্দরের পাশাপাশি আধুনিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘর্ষের চিত্র তুলে ধরে।
কিউরেটর শিল্পী মাহবুর রহমানের ‘নেট ওয়েট: দ্য স্ট্যান্ডারাইজড সেলফ’ শিরোনামের কাজটিতে কয়েকটি দৃশ্যমান প্লাস্টিকের অভিজাত বাক্সে একের পর এক সাজানো পণ্য দেখা যায়। স্বচ্ছ প্লাস্টিকে মানুষের সম্ভবত শিল্পীর নিজেরই নাক, কান, চোখ, আঙুল—এমন চিত্র দিয়ে করপোরেট বাণিজ্যের প্রসঙ্গে অর্থপ্রবাহের আতিশয্যে মানুষ ও তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আবশ্যিক পণ্যের তালিকায় নামিয়ে আনার ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে সনদ বিশ্বাসের প্রকল্প অ্যানিমেটেড ভিডিও আর্ট, যার নাম ‘অসম্পূর্ণ কিংবদন্তি’। গ্যালারির ভেতরে ছোট্ট একটি অন্ধকার ঘরে প্রজেকশন হচ্ছে শ্মশানে এক তান্ত্রিক গুরু ধ্যানমগ্ন; পরের দৃশ্যে এক মাংসভুক সুপারম্যান ও তৃণভোজী ডাইনোসরের ছবি, ওদের মধ্যে সংঘর্ষ। শেষ পর্যন্ত দুটি দৃশ্য মিলিয়ে ডাইনোম্যান তৈরি হয়। আয়োজকরা বলছেন, ব্যঙ্গাত্মক হলেও সীমানা ঠিক রাখার তাগিদ ধরে কাজটি দর্শকের জন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা।
ইমরান হোসেন পিপলুর সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানান, গ্রাফিক ডিজাইনারদের সৃজনশীল কাজ অনেক সময় সেবাগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের মনঃপূত হয় না, এতে তাঁর সৃজনসত্তা ধাক্কা খায়। তাঁর কথায়, তাঁরা চেয়েছেন সেই রিজেকশনকে নিয়েই শিল্পীর স্বকীয় চিন্তা এবং তাঁদের কাজকে কেন্দ্র করে দর্শকের সঙ্গে একটি মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে।
পিপলু কাগজের ভাস্কর্যই বেশি করেন, তবে অন্যান্য মাধ্যমেও কাজ করেন। পেশাগত পরিচয়ে তিনি গ্রাফিক ডিজাইনার—এমনটি জানিয়ে কথার ফাঁকে তাঁর কাজ দেখানো হয়। ‘মার্জিনস অব এরর’ শিরোনামের তিনটি কাজের মধ্যে কোনাকুনি দুই দেয়ালে বিশাল অক্ষরে লেখা সংলাপ রয়েছে। প্রথমটিতে নানা রঙে ছোট-বড় ইংরেজি অক্ষরে লেখা ‘ফুড ফর দ্য হাংরি’, এরপর ‘(সেফ নয়) ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। শেষটিতে লেখা ‘স্মলেস্ট স্টেজ ইউএস ইজ ইউএন আইডেনটিফাইড’! অক্ষর সাজিয়ে সামান্য কটি বাক্যে ব্যঙ্গভাবের প্রকাশ এবং বিশ্ব সংস্থার অকার্যকারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাবও ধরা পড়েছে।
গ্রাফিক ডিজাইন কাজে অক্ষর দিয়ে নকশা রচনায় মিতা মেহেদীর দক্ষতা লক্ষ্য করা যায়। প্রদর্শনীর জন্য তিনি তিনটি চিত্রপটে রঙিন কাপড় কেটে ঢাকা মহানগরের তিনটি এলাকা—যথাক্রমে কলাবাগান, ভূতের গলি ও কাঁটাবন—শব্দ লিখে ওই তিন এলাকার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে এর নামকরণের ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন।
‘ভূতের গলি’ নামের চিত্রপট কালোর মধ্যে গলির অবয়ব রচেছেন শিল্পী ছাইরং ও কাছাকাছি কিছু অনুজ্জ্বল রঙের বস্ত্রখণ্ড দিয়ে। ইলেকট্রিক খাম্বা ও তার, মাকড়সার জাল—এসব উপাদান গলিকে শিল্পিত উপায়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। ‘কলাবাগান’ চিত্রপটে কলাগাছময় বিন্যাসে পেছনে লাল সূর্য আর সামনে পথ—সে পথ ধরে ঢাকার বাহন রিকশাও দেখা যায়। তৃতীয় পট ‘কাঁটাবন’ তথৈবচ কণ্টকময় তাঁর নকশা রচনায়।
‘উই আর নাইনটি এইট পারসেন্ট হিউম্যান’ শিরোনামে মেহেদী হাসান মানব অবয়বসদৃশ মুখোমুখি তিন গুণিতক ছয়টি দেহকাঠামোর অভ্যন্তরে ইলাস্ট্রেশনের মতো রেখাঙ্কনে আবার কতক অবয়ব ও কাঠামো ফুটিয়ে তুলেছেন। একটি নারী অবয়বের ফ্রকের মতো বৃত্তাকার নকশায় একটি স্লোগান দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করেছেন; তাঁর মাধ্যম প্লাস্টিক কাগজের বোর্ড।
নগরকেন্দ্রে কিংবা দূরপাল্লার পথের ধারে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডের বিষয়টি আলোকপাত করেছেন নবীন শিল্পী আলী সাগর। গ্যালারির ভেতরে ইংরেজি বর্ণে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘ফিল মোর’। এর নিচে একটি হার্ট এবং সেটিকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে লেখা ‘মেড বাই দ্য ইউনিভার্স’-এর নিচে যে লেখাটি রয়েছে, সেটি বাংলা অর্থে দাঁড় করাতে গিয়ে বলা হয়েছে—আমাদের অসম্পন্ন সৃজন দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চেষ্টা করেছি, কারণ সবশেষে অনুভূতিই সবকিছু।
মনির মৃত্তিক গ্যালারির মেঝের একটি জায়গায় সবুজ, হলুদ ও নীল রঙের প্লাস্টিকের পাটি বিছিয়ে নদীসহ বড় একটি জমিন তৈরি করে তার ওপর ‘উন্নয়ন’ লেখা ক্ষুদ্রকায় লালচে ইট সাজিয়ে নানা স্থাপনার সমাবেশ ফুটিয়ে তুলেছেন। একপাশে ওই ইট দিয়ে আগ্রহী দর্শক চাইলে নিজের পছন্দমতো কিছু বানাতে পারবেন—এমন ভাবনাও কাজের বিন্যাসে প্রতিফলিত। শিল্পীর ভাষ্য, সবুজের শরীরে কংক্রিটের হানা নিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ফসলি জমিতে উন্নয়নের ইট স্থাপনা প্রকৃতিকে দিন দিন সংকুচিত করছে।
করপোরেট বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন শিমুল দত্ত। তাঁর কাজের নাম ‘ইন আ পারফেক্ট ইলিউশন’; সাদা দেয়ালে ঝোলানো ক্যাপসুল, ডিম, চাল ও সম্পদের বস্তার ওপর নানা লেখা দেখা যায়। যেমন ক্যাপসুলের গায়ে ইংরেজিতে লেখা—তোমার স্বাস্থ্য আমার অধীনে। ডিমে লেখা—মেয়াদকাল অসীম!
পীযূষ তালুকদার পিন্টু গড়েছেন ‘গুজবের কান’। দেয়ালে ঝুলছে বড় আকৃতির একটি কান; কানের ফুটো দিয়ে ঝুলছে নানা রঙের সুতো। দুপাশে লেখা আছে—‘এই নিয়েছে ঐ চিল, যা কান নিয়েছে গুজবে’। মানবসমাজে, বিশেষ করে স্বল্পশিক্ষিত সমাজে গুজব ছড়ানো সহজ ও আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে—এ ধরনের পর্যবেক্ষণও কাজের বার্তা হিসেবে ধরা পড়ে।
দক্ষিণের কাচের দেয়ালে ১০ জন শিল্পীর যৌথ অংশগ্রহণে কাগজ ও প্লাস্টিক কেটে মজার ইমেজ তৈরি করা হয়েছে; দর্শকদের জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আয়োজকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম মন দিয়ে কাজগুলো দেখছে ও ছবি তুলছে।
প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ৮ আগস্ট। দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে রোববার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।