দুই বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে সিলেটের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ‘দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং চেম্বার ভবনে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সভাপতি তাহমিন আহমদ আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ১০ ডিসেম্বর তৎকালীন পর্ষদ ভেঙে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও আদালতের একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে এই সিদ্ধান্ত আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয় এবং এরপর আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

নতুন সরকার গঠনের পাঁচ মাস পার হলেও শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটি সচল না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম হতাশ। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’ নিয়োগের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ী সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নির্বাচিত পর্ষদ না থাকায় আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সিলেটে ব্যবসায়ীদের দাবি-দাওয়ার কথা বলার মতো কেউ না থাকায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বিষয়ে অনেকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছেন। মন্ত্রী তাদের সাথে বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন এবং অনেকে তার কাছে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের আবেদন জানিয়েছেন।

বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ীর মতে, সরকারি প্রশাসক তার প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে চেম্বারে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই একজন ব্যবসায়ীবান্ধব ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রশাসক নিয়োগ করে সংকট সমাধান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। মন্ত্রী চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক প্রশাসক পদের আলোচনায় রয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা নাসিম হোসাইন, যিনি এর আগে চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সিলেট চেম্বারের সাবেক সহসভাপতি হিজকিল গুলজার এবং সর্বশেষ কমিটির পরিচালক এজাজ আহমদ চৌধুরী। তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাসিম হোসাইনের সম্ভাবনাই বেশি বলে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগকে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল এবং স্বার্থপরিপন্থি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, বর্তমান প্রশাসকের অধীনেই দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে চেম্বারকে গতিশীল করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সিলেট চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ বা সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক বসালে সেটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রশাসক বসালে ব্যবসায়ীদের কোনো ফায়দা হবে না। কারণ, সরকারি কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করার সাহস রাজনৈতিক প্রশাসকের থাকবে না; তিনি সরকারের পক্ষেই সাফাই গাইবেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরাও চাই সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাক, পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা যেন নির্বিঘ্নে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন। রাজনৈতিক প্রশাসক বসিয়ে সেই সুবিধা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।”

প্রসঙ্গক্রমে ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, “নির্বাচনের আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিলেটে এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন—তারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার আসার পাঁচ মাস হয়ে গেলেও আমরা এখনও সেই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি।”

ব্যবসায়িক সংগঠনের অচলাবস্থা দ্রুত দূর না হলে বিনিয়োগ সংকট কাটবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে দ্রুত সক্রিয় করে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ তৈরিতে নতুন সরকার আন্তরিক হবে।

অন্যদিকে, সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক এনামুল কুদ্দুস চৌধুরী রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, সরকারি প্রশাসক দিয়ে প্রায় ২০ মাস ধরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কিন্তু একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে, যার ফলে তিনি নিয়মিত চেম্বারে সময় দিতে পারেন না। কয়েক হাজার ব্যবসায়ীর এই সংগঠনকে গতিশীল করতে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী প্রশাসক নিয়োগের পক্ষে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তিনি দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক খন্দকার সিপার আহমদ ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’ নিয়োগে আপত্তি না জানালেও দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে একজন অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও সৎ ব্যক্তিকে প্রশাসক করা হলে আপত্তি নেই। সরকারি প্রশাসকের চেয়ে ব্যবসায়ী প্রশাসক এলে চেম্বার অন্তত কিছুটা সক্রিয় হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সিলেট চেম্বার ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া এটি চলায় ক্ষতি হচ্ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া চেম্বার পুরোপুরি সক্রিয় হবে না, দেশীয় বাণিজ্য কিংবা বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে না। তাই দ্রুত নির্বাচন দিয়ে চেম্বার সক্রিয় করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”

সম্প্রতি সিলেট চেম্বার ভবনে দেখা যায়, সচিবসহ চারজন কর্মকর্তা নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করছেন। সদস্য হালনাগাদ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় দু-একজন ব্যবসায়ী আসা-যাওয়া করলেও সামগ্রিক কার্যক্রমে স্থবিরতা স্পষ্ট।

চেম্বারের সচিব গোলাম আক্তার ফারুক জানান, বর্তমান প্রশাসক মূলত রুটিন কাজগুলো করছেন। ১ জুলাই থেকে সদস্য নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এই নবায়নকৃত সদস্যরা পরবর্তীতে ভোটার হবেন।

সিলেট চেম্বারের বর্তমান প্রশাসক ও সিলেট জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা বলেন, নতুন অর্থবছরের শুরুতে সদস্য নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে, তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও বলা যাচ্ছে না।