বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে জুলাই মাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মারক নয়, বরং নাগরিক সাহস, আত্মত্যাগ, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের প্রতীক। সংকটের মুহূর্তে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বয়স ও মতের মানুষ যে সাহস, সংহতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে, তা প্রমাণ করে—জাতীয় স্বার্থ যখন মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সব বিভাজনের সীমারেখা অতিক্রম করা সম্ভব। এই সম্মিলিত চেতনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মূল্যবান সম্পদ, যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার মূল প্রেরণা।

সোমবার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ স্মরণানুষ্ঠানে’ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী বলেন, "মূল উপলব্ধিটি হলো—আপনি সংবিধান সংশোধন করলেন, পার্লামেন্ট অ্যাক্টের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করলেন, কিন্তু দেখা গেল কোনো একসময় ছিদ্রপথে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটল। তখন এসব আইন কিন্তু আমাদের সুরক্ষা দিতে পারে না। যেমন শেখ হাসিনা একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য ধ্বংসাত্মক আন্দোলন করেছিলেন, আবার পরবর্তীতে নিজের হাতেই তা সংবিধান থেকে মুছে দিয়েছিলেন। তাই কাগজে লেখা একটি আইন সবাই মান্য করবে—এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মূল বিষয়টি হলো মানুষের মানসিকতা। এটি শুধু আইনি বা লিগ্যাল বিষয় নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।"

রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটি সাধারণ ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "আমরা মতাদর্শগত বিতর্ক বা আলোচনা-সমালোচনা করলেও, সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত না হয়—সেই দিকটি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। মানসিকতার এই পরিবর্তন না হলে সংবিধান সংশোধন বা আইন প্রণয়ন—কোনোটিই কার্যকর হবে না।"

একটি জাতির শক্তির ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রিজভী বলেন, "শুধু ভূখণ্ড, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর একটি জাতির শক্তি নির্ভর করে না। তার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয় ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধের ওপর। জাতীয় স্মৃতি কোনো অতীতচারিতা নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, নৈতিক চেতনার উৎস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশনা। যে জাতি তার ইতিহাসকে সত্যনিষ্ঠভাবে ধারণ করতে পারে, সে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, অর্জনকে সংরক্ষণ করে এবং ভবিষ্যৎকে আরও দায়িত্বশীলভাবে নির্মাণ করে। পক্ষান্তরে, ইতিহাস যদি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা সাময়িক ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ক্ষণিকের আবেগ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐকমত্য বা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে না। তাই ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা মানে শুধু স্মরণ করা নয়—সত্যের প্রতি আনুগত্য এবং সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা রাখা।"

নিজের রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত জীবনে কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর না করে কঠোর পরিশ্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। লক্ষ্য অর্জনে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। নেতাকর্মীদের মনে একটি আদর্শিক বোধ থাকলে রাজনৈতিক সাফল্য আসবেই।

অনুষ্ঠানে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর বিভিন্ন ঘটনা ও কর্মকাণ্ডের কথা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।