জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, হিসাবরক্ষণে গরমিল এবং এক শিক্ষকের একই সঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সত্যতা পাওয়া গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আকস্মিক পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়ে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) অবহিত করা হয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন উপজেলার ‘আব্দুল আজিজ চৌধুরী জুনিয়র বিদ্যালয়’ পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের পর বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক গুরুতর অনিয়মের চিত্র সামনে আসে।
তদন্তে জানা যায়, বিধিসম্মত আর্থিক কমিটি গঠন না করেই প্রধান শিক্ষক তার পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিল ও ভাউচার তৈরি করে বিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহার করছেন। সরকারি নির্ধারিত বিধি অনুসরণ না করে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই অর্থ খরচ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে হিসাব খুলে লেনদেন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি; বরং নৈশপ্রহরী ও একজন খণ্ডকালীন শিক্ষককে দিয়ে আর্থিক লেনদেনের কাজ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার সজল কুমার ভদ্র বলেন, "এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে খরচ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না খুলে নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা খরচ করা হয়েছে এবং গত প্রায় ছয় বছর ধরে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব রাখা হয়নি।"
পাশাপাশি, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক লুৎফন নাহারের আত্মীয় এবং গণিত শিক্ষক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ উঠেছে। তিনি এই বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত পদে কর্মরত থাকার পাশাপাশি ‘আলহাজ হেলাল উদ্দিন নুরুন্নাহার কলেজ’-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাবিবুর রহমান প্রতিদিন বিদ্যালয়ে এসে কেবল হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে কলেজে চলে যান, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার স্পষ্ট করেছেন যে, সরকারি আইন অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষকের একই সঙ্গে দুটি পদে চাকরি করার সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, "আমার বাবার একটি নন-এমপিও কলেজ রয়েছে। সম্প্রতি বাবা মারা যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সেটি দেখাশোনা করছি এবং অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছি। কলেজটি চালাতে গিয়ে আমরা চরম সংকটে পড়েছি। তবে এর কারণে স্কুলে ক্লাস নেওয়া ব্যাহত হয় না। আমি আগে স্কুলে ক্লাস নিই, তারপর কলেজে যাই।"
অন্যদিকে, প্রধান শিক্ষক লুৎফন নাহার বলেন, "হাবিবুর রহমান তার বাবার কলেজ দেখাশোনা করেন—তা আমার জানা আছে। তবে তিনি এখানে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, তাই আমার অন্য কিছু দেখার প্রয়োজন পড়ে না।"
আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, নতুন বিদ্যালয় হওয়ায় তহবিলের পরিমাণ খুবই কম এবং টাকা আসার আগেই খরচ হয়ে যায়। তবে সব খরচের হিসাব ও বিল-ভাউচার সংরক্ষিত আছে বলে তিনি জানান।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, "বিদ্যালয়টি পরিদর্শনকালে বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্পষ্ট গড়মিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অন্য একটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়গুলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। বিধি মোতাবেক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"