বরিশাল জেলা ও মহানগর এলাকায় গত ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডসহ ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলে অন্তত ৩১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ৭৯টি ধর্ষণ এবং ২৭৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা স্থানীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ২ হাজার ১৪১টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে খুনের পাশাপাশি ১৩৮টি চুরি ও সিঁধেল চুরি এবং ৬৩৮টি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ অন্তর্ভুক্ত।

মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ২৭৫টি অপরাধের মধ্যে ছিল ৬টি খুন, ১৭টি চুরি ও সিঁধেল চুরি, ৩৬টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১১টি ধর্ষণ, ৩টি ডাকাতি এবং ৮১টি মাদকসংক্রান্ত মামলা। ফেব্রুয়ারিতে ২৬৮টি অপরাধের মধ্যে ৩টি খুন, ১৮টি চুরি, ৩৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১০টি ধর্ষণ এবং ৫৫টি মাদকসংক্রান্ত ঘটনা ঘটে। মার্চ মাসে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে ৩৪৭টিতে দাঁড়ায়, যার মধ্যে ছিল ৬টি খুন, ৩৩টি চুরি, ৩১টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ৮টি ধর্ষণ এবং ১০৬টি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ।

এপ্রিলে মোট ৩৯২টি অপরাধের মধ্যে ৫টি খুন, ২৯টি চুরি, ৫২টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৬টি ধর্ষণ এবং ১০৪টি মাদকসংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মে মাসে—মোট ৪৫৮টি। এর মধ্যে ছিল ৬টি খুন, ২৩টি চুরি, ৭১টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ২০টি ধর্ষণ এবং ১৫৮টি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। জুন মাসে ৪০১টি অপরাধের মধ্যে ৫টি খুন, ১৮টি চুরি, ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৪টি ধর্ষণ এবং ১৩৪টি মাদকসংক্রান্ত অপরাধের তথ্য পাওয়া গেছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল নগর সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, "নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মে মাসে সর্বোচ্চ ৭১টি। একই মাসে ধর্ষণের ঘটনাও সর্বোচ্চ ২০টি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ ১৫৮টি। এমন পরিস্থিতি আসলেই ভয়াবহ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ অবস্থায় কঠোর হতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। যত দ্রুত সম্ভব অপরাধীদের যেমন আইনের আওতায় আনা জরুরি, ঠিক তেমনি কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম বাড়ানো উচিত। অপরাধ কমাতে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি অপরাধীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যেন কোনো অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।"

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু আল রায়হান বলেন, "অপরাধ যেভাবে বাড়ছে, তাতে মামলার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এসব তথ্য সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নিরাপত্তার অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকায় না থাকলে অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। এতে যেমন সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে, তেমনি বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।"

আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‍্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‍্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।"