পূর্ব সুন্দরবনে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দুইবার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরবর্তীতে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় বাঘকে। বনকর্মীদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই দৃশ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিসের সামনে শ্যালা নদীর পাড় দিয়ে একটি বাঘিনী এসে খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় জঙ্গলে ফিরে যায়। উপস্থিত বনকর্মীরা এই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন।

এর পর রোববার (২৬ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে নদী সাঁতরাতে দেখা যায় আরেকটি বাঘকে। বন থেকে নেমে বাঘটি নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলেও বোটের শব্দ পেয়ে পুনরায় তীরে ফিরে যায়। বিরল এই দৃশ্যটি ভিডিও করেন বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান।

সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সাইফুর রহমান বলেন, "টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নিয়মিত টহলকালে হঠাৎ বন থেকে একটি বাঘকে নদীতে নেমে সাঁতার কাটতে দেখি। বাঘটি প্রায় নদীর মাঝামাঝি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে আমাদের বোটের শব্দ শুনে সেটি আবার তীরে ফিরে যায়। এমন দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না, তাই দ্রুত মোবাইলে ধারণ করি।"

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বনজীবী ও পর্যটকদের বিচরণ বন্ধ রয়েছে। ফলে বনাঞ্চল সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত হয়ে ওঠায় বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় অপরাধ দমন সম্ভব হয়েছে, যার ফলে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, "সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, সীমানা পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে টহলের সময় এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না।"

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের বিচরণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে এবং আন্ধারমানিক এলাকায় বন অফিসের সামনে বাঘের উপস্থিতি তারই প্রমাণ। তিনি জানান, "এটি গত ১৩ জুলাই অবমুক্ত করা বাঘিনী নয়, বরং ভিন্ন একটি বাঘিনী বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপিত ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিও রেকর্ড করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের সময় বনকর্মীরা আগের চেয়ে বেশি বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছেন, যা সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অবাধ বিচরণের ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করছেন তারা।