কক্সবাজারের চকরিয়া রেলস্টেশনে বেড়েছে চুরি-ছিনতাই। এতে সন্ধ্যা নামলেই ভয়ে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। নগদ টাকা, মুঠোফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়ানোর পাশাপাশি ছিনতাইকারীদের হামলায় আহতও হচ্ছেন যাত্রীরা।

রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, চকরিয়া স্টেশনে গত দুই মাসে ২৩-২৫টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে ঘটেছে বেশির ভাগ ঘটনা। এ ছাড়া চকরিয়ায় ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

রেল কর্মকর্তারা জানান, চকরিয়া উপজেলা পার্শ্ববর্তী দুটি জেলায় ট্রেনে যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। চকরিয়ার পূর্বে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা, আলীকদম, থানচি; পশ্চিমে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার একাংশ। এসব উপজেলার মানুষ চকরিয়া উপজেলার তিনটি রেলস্টেশন হয়ে ট্রেনে যাতায়াত করে।

যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চকরিয়া উপজেলার তিনটি রেলস্টেশনই এমন জায়গায় স্থাপিত হয়েছে, যেখানে রাতের বেলা তো দূরের কথা, দিনেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন যাত্রীসহ স্থানীয় লোকজন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রেল পুলিশের কার্যক্রম না থাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়েছে।

চকরিয়ার মূল শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চিরিংগা-বদরখালী সড়কের সাহারবিল পরিষদ এলাকায় চকরিয়া রেলস্টেশনের অবস্থান। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে দেখা যায়, পরিষদ এলাকায় একটি ওভারপাস আছে। নিচ দিয়ে যানবাহন ও জনসাধারণ চলাচল করে আর ওপর দিয়ে চলে ট্রেন। ওভারপাসের দুই পাশ দিয়ে রেলস্টেশনে যেতে অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এই অ্যাপ্রোচ সড়কে সড়কবাতি নেই। তবে রেলস্টেশনের মূল প্ল্যাটফর্মে পর্যাপ্ত আলো ও সড়কবাতি রয়েছে।

অন্তত ৯টি ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সব কটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে এই অ্যাপ্রোচ সড়কে। কখনো হেঁটে যাওয়া যাত্রীর গলায় ছুরি ধরে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। কখনো ইজিবাইক (টমটম) আটকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা, মুঠোফোন, ব্যাগ ও জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

১৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রামে যাওয়ার ট্রেনের উদ্দেশে চকরিয়া রেলস্টেশনে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ রাশেদ (২৫)। তাঁর বাড়ি চকরিয়া পৌরসভার দক্ষিণ বাটাখালী গ্রামে। অ্যাপ্রোচ সড়কে পৌঁছামাত্র তিন দুর্বৃত্ত গলায় ছুরি ধরে তাঁর মুঠোফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। মোহাম্মদ রাশেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে বোনের বাসায় যেতে চকরিয়া রেলস্টেশনে যাচ্ছিলাম। স্টেশনের একদম কাছেই অ্যাপ্রোচ সড়কে আমাকে বহনকারী ইজিবাইক আটকে ছুরি ধরে সাড়ে তিন হাজার টাকা ও একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তাৎক্ষণিক পুলিশ ও রেল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেও কোনো ফল পাইনি।’

সাহারবিল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান আজিজুল হাকিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রেলস্টেশন চালু হওয়ার পর অন্তত অর্ধশতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভোগান্তির ভয়ে দূরবর্তী এলাকার যাত্রীরা থানায় অভিযোগ করতে যায় না।’

চকরিয়া অঞ্চলের তিনটি স্টেশনে রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) কোনো ফাঁড়ি নেই। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কোনো কার্যক্রমও নেই। এ কারণে ছিনতাইকারীরা নির্বিঘ্নে একের পর এক অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

চকরিয়া রেলওয়ে স্টেশনের ইনচার্জ মো. ফরহাদ বিন জাফর চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গত দুই মাসে ২৫টির বেশির ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের কাছে কমপ্লেইন খুব কমই হয়। তবে ছিনতাইয়ের শিকার সবাই আমার কাছে আসেন। ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিনটি চক্রের নাম ঘুরেফিরে আসে। তাঁদের বিষয়ে থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছে। তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, চকরিয়া থানার পুলিশ রেলস্টেশনের যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে রেল পুলিশ নিয়োজিত না হওয়া পর্যন্ত নানামুখী ঝামেলা অব্যাহত থাকবে। কারণ, ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে চকরিয়া থানা এলাকাটি বেশ বড়। এ কারণে তিনটি রেলস্টেশনের পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা থানা-পুলিশের পক্ষে যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার।