নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ট্রফিটি যখন হাতে নিলেন লামিনে ইয়ামাল, তাঁর বয়স তখন ১৯ বছর ৬ দিন। অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন বিশ্বকাপ জয় করল। এর মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২০ বছর বয়স হওয়ার আগেই ইউরো এবং বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন ইয়ামাল। অথচ মেসি ও রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
রেকর্ড ভাঙার এই যাত্রা ইয়ামালের শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জর্জিয়ার বিপক্ষে অভিষেকের সময় ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় এবং সেই ম্যাচেই গোল করে হয়ে যান জাতীয় দলের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বকনিষ্ঠ শুরুর একাদশে থাকা এবং এল ক্লাসিকোয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার মতো একাধিক মাইলফলক তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার।
বিশ্বজুড়ে খেলার প্রতিটি অঙ্গনে এখন কিশোর-কিশোরীরাই নতুন ইতিহাস লিখছেন। ক্রীড়াবিষয়ক ওয়েবসাইট দ্য অ্যাথলেটিক এমন কয়েকজন প্রতিভাকে সামনে এনেছে।
ক্রিকেট বিশ্বে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিস্ময় বৈভব সূর্যবংশী। এই সপ্তাহেই হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টি-টুয়েন্টি ম্যাচে ১৫ বছর ১১৮ দিন বয়সে মাত্র ১৮ বলে ফিফটি তুলে নেন তিনি। এর মাধ্যমে নেপালের কুশল মাল্লার রেকর্ড এবং একসময়ের বিস্ময়বালক শচীন টেন্ডুলকারের ১৬ বছর ২১৩ দিনের কীর্তিকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। এটি ছিল তাঁর মাত্র চতুর্থ আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ম্যাচ। এই মাসেই তিনি ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
সূর্যবংশীর এই চমক শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আইপিএলে গুজরাট টাইটানসের বিপক্ষে মাত্র ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে তিনি হয়ে যান টি-টুয়েন্টি ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান। ১১টি ছক্কা ও ৭টি চারে গড়া সেই ১০১ রানের ইনিংসে ৯৪ রানই এসেছিল বাউন্ডারি থেকে।
অ্যাথলেটিকস অঙ্গনে ১৮ বছর বয়সী গাউট গাউট সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০ মিটারে ১৯.৬৭ সেকেন্ড টাইমিং করে জাতীয় রেকর্ড গড়েছেন, যা উসাইন বোল্টের ১৭ বছর বয়সের টাইমিং (১৯.৯৩) থেকেও দ্রুত। ২০০ মিটারে ২০ সেকেন্ডের গণ্ডি ভাঙা প্রথম অস্ট্রেলিয়ান তিনি এবং এই টাইমিং তাঁকে অনূর্ধ্ব-২০ বিভাগে বিশ্ব রেকর্ডধারী করে তুলেছে। ২০২৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ১৯৬৮ অলিম্পিকের রুপাজয়ী পিটার নরম্যানের ৫৬ বছরের পুরোনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছিলেন। বোল্ট নিজেই ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, গাউটকে দেখতে লাগে তরুণ বয়সের তাঁরই মতো।
টেনিস বিশ্বে ১৯ বছর বয়সী রাশিয়ান মিরা আন্দ্রিভা জুন মাসে রোলাঁ গারোর ফাইনালে মায়া চফালিনিয়েস্কাকে ৬-৩, ৬-২ গেমে হারিয়ে প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জিতেছেন। ১৯৯২ সালে মনিকা সেলেসের পর তিনি ফরাসি ওপেনের সর্বকনিষ্ঠ নারী চ্যাম্পিয়ন। পুরো টুর্নামেন্টের সাতটি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটি সেটে হেরেছিলেন তিনি। এর আগে ২০২৫ সালে ১৭ বছর বয়সে ইন্ডিয়ান ওয়েলস মাস্টার্সের ফাইনালে আরিনা সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা জেতেন তিনি। ২০২৪ ফরাসি ওপেনেই সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে ১৯৯৭ সালের পর গ্র্যান্ড স্লামের সর্বকনিষ্ঠ সেমিফাইনালিস্ট হয়েছিলেন আন্দ্রিভা।
ফর্মুলা ওয়ান ইতিহাসে ইতালিয়ান তরুণ কিমি আন্তোনেল্লি মার্চে জাপান গ্রাঁ প্রি জিতে মাত্র ১৯ বছর বয়সে সবচেয়ে কম বয়সে লিডারবোর্ডের শীর্ষে উঠে গেছেন। এর আগে চীন গ্রাঁ প্রিতে জিতে তিনি হয়েছিলেন সর্বকনিষ্ঠ পোল পজিশনজয়ী চালক। মৌসুমের শুরুতে টানা তিনটি রেস জিতে রেকর্ড গড়েন তিনি। জুলাই পর্যন্ত মার্সিডিজের হয়ে চারটি জয়, তিনটি পোল পজিশন এবং আটটি পোডিয়াম তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে, যেখানে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৪৫ পয়েন্ট এগিয়ে।
১৯২৭ সালের পর সবচেয়ে কম বয়সে ট্যুর ডি ফ্রান্সে অংশগ্রহণকারী পল সেইজা ১৮তম স্টেজে হোয়াইট জার্সি (সেরা তরুণ রাইডার) জিতে প্রতিযোগিতার ৮৯ বছরের ইতিহাসে এই জার্সির সর্বকনিষ্ঠ অধিকারী হয়েছেন। মৌসুমজুড়ে তিনি রেমকো এফেনেপুল এবং ফ্লোরিয়ান লিপোভিচের মতো তারকাদের হারিয়েছেন এবং ট্যুর অব বাস্ক কান্ট্রি ও লা ফ্লেশ ওয়ালোনে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী হয়েছেন।
আর্সেনালের ম্যাক্স ডাউম্যান এক মৌসুমেই একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন। ১৫ বছর ২৩৫ দিনে প্রিমিয়ার লিগের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় এবং ১৬ বছর ৭৩ দিনে এভারটনের বিপক্ষে গোল করে হয়ে যান সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। এছাড়া ফিল ফোডেনের রেকর্ড ভেঙে তিনি হয়ে যান সর্বকনিষ্ঠ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তিনি সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
ডার্টস বিশ্বে জানুয়ারিতে টানা দ্বিতীয়বার পিডিসি বিশ্ব ডার্টস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন লুক লিটলার। ১৭ বছর ৩৪৭ দিন বয়সে ২০২৫ সালে তিনি হয়ে যান ডার্টস ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বর্তমানে তাঁর নামের পাশে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড ম্যাচপ্লে, প্রিমিয়ার লিগ এবং গ্র্যান্ড স্লামসহ মোট ২৭টি পিডিসি শিরোপা রয়েছে।
সাঁতারের দুনিয়ায় ১৯ বছর বয়সী এক প্রতিভাময় সাঁতারু জুলাইয়ে কানাডিয়ান সুইমিং ট্রায়ালসে ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে ২:০১.৬৫ সময়ে সাঁতার কেটে ২০০৯ সাল থেকে টিকে থাকা বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছেন। বর্তমানে চারটি ইভেন্টে বিশ্ব রেকর্ড তাঁর দখলে। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে তিনটি সোনা ও একটি রুপা জিতে এক আসরে তিন সোনাজয়ী প্রথম কানাডিয়ান হয়েছেন তিনি।
বাস্কেটবল অঙ্গনে ডালাস ম্যাভেরিকসের কুপার ফ্ল্যাগ ২০২৬ এনবিএ রুকি অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছেন, যেখানে তাঁর গড় ছিল ২১ পয়েন্ট, ৬.৭ রিবাউন্ড এবং ৪.৫ অ্যাসিস্ট। ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে এনবিএ ইতিহাসে একমাত্র ৪০ পয়েন্টের ম্যাচ তাঁরই এবং ২০ ও ৩০ পয়েন্টের ম্যাচে লেব্রন জেমসের পরই তাঁর অবস্থান।
বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াবিজ্ঞানী শন কামিং বলেন, আধুনিক ক্লাব ও ফেডারেশনগুলোর বিস্তৃত স্কাউটিং নেটওয়ার্ক আর বিনিয়োগের কারণেই প্রতিভা এখন আগেভাগে চোখে পড়ছে, আর দ্রুত সুযোগও পাচ্ছে। ইয়ামালকেও বার্সেলোনা খুঁজে পেয়েছিল যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।
নিউইয়র্কে ট্রফি উদযাপনের সময় ইয়ামালের তিন বছরের ছোট ভাই কেইনের সাথে তাঁর যে আবেগঘন মুহূর্ত দেখা গেছে, তা যেন ইঙ্গিত দেয় এই সাফল্যের ধারা কেবল শুরু। ইয়ামাল, সূর্যবংশী, গাউট, আন্দ্রেভা, আন্তোনেল্লি, সেইজা, ডাউম্যান, লিটলার, ম্যাকইনটশ এবং ফ্ল্যাগ—এই নামগুলো প্রমাণ করছে যে খেলাধুলার ইতিহাসে বয়স এখন আর সীমানা নয়, বরং কেবল একটি সংখ্যা।