কয়েকদিন ধরে ঢাকায় তীব্র রোদ আর গুমোট গরম। সারা দিন যেন এক ঝিমধরা দুপুর। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে পথচলা মানুষের মনে ক্ষীণ আশা ছিল, আজ হয়তো কালবৈশাখী আসবে। বিকেলে আকাশে কিছুটা মেঘ জমলেও সন্ধ্যার আগেই সব মিলিয়ে গেল। নষ্ট সিলিং ফ্যানের নিচে মেঝেতে ঘুমানোর চেয়ে দ্বীপের কাছে ভালো মনে হয় খালপারে গিয়ে সময় কাটানো।
ভ্যাপসা গরমের মাঝেও দ্বীপের প্রতিদিনের অভ্যাস সন্ধ্যার পর খালপারে যাওয়া। কখনো বন্ধুদের সাথে, কখনো একা। তবে একা যাওয়াটা কিছুটা ঝামেলার, কারণ জয়েন্ট কাটিংয়ের সময় কেউ কাগজ ধরে রাখলে সুবিধা হয়। কিন্তু আজকের এই গুমোট আবহাওয়ায় আলস্যের কারণে কাউকে ডাকতে ইচ্ছে করল না দ্বীপের। তাই একাই চলে এল সে। খালপারের আধো আলোয় হাঁটু গেড়ে বসে জয়েন্ট বানাতে গিয়ে দেখে পকেটে লাইটার নেই। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রুপের কাছ থেকে লাইটার চেয়ে আগুন জ্বালিয়ে ফাঁকা বেঞ্চে বসে পড়ল সে।
ফটোকপির দোকানগুলোর পেছনে ড্রেনের লাইন আর আবর্জনার স্তূপের পাশেই এই ছোট ফাঁকা জায়গাটি দ্বীপের খুব প্রিয়। এখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অফিসফেরত নানা মানুষ ভিড় করে। অন্ধকারের মাঝেও একে অপরের মুখচেনা হয়ে ওঠে সবার। আশেপাশে ইউকুলেলে হাতে কেউ গান গাইছে, আবার কেউ ফোনে গান বাজাচ্ছে—সব মিলিয়ে এক পরিচিত ধারাবাহিকতা। পাশে একটি ফাঁকা দোকানঘরে সবসময় কিছু ছেলের ভিড় থাকে, যা দ্বীপের মনে কৌতূহল জাগায় প্রতিদিন।
দ্বীপের মনে পড়ে যায় তার গ্রামের কথা। সে বলে, "এখন খালপারে বসে সেই সব দিন অবাস্তবই লাগে। এই আলোর শহরে বসে বিশ্বাস হইতে চায় না যে এত অন্ধকার, এত নীরব হওয়াও সম্ভব পৃথিবীর পক্ষে! সাদা আকাশের নিচে বুক ভরে ধোঁয়া টানতে গিয়ে চোখে ভাসে মাঝিপাড়ার মাটির কল্কিগুলা। গাঁজার পুরের সাথে সেখানে দিতে হতো ছোট একটা নারকেলের ছোবার বল। এরপর তাতে আগুন দিয়ে সেই কল্কি মাথায় ঠেকায় একটান। সেই আয়োজনে ভরা দুনিয়া থেকে কোথায় চলে এল সে! আবর্জনায় ভরা দুর্গন্ধের পাশে বসে করতে হয় স্বস্তির আয়োজন!"
ঢাকা শহরের ভিড়ে একা থাকা অস্বস্তিকর হলেও এই খালপারে দ্বীপ শান্তি খুঁজে পায়। এখানে সে ইচ্ছেমতো চিৎকার করতে পারে অথবা চুপচাপ বসে জোন-আউট হতে পারে। মূলত বাড়ির কথা ভাবার নির্ঝঞ্ঝাট অবসরের খোঁজে সে এখানে আসে। তার গ্রামের আকাশ হতো হালকা গোলাপি আর চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিদ্যুৎহীন সেই অন্ধকার ঘরে বিছানার নিচে ঘুমাত দুটি ছাগলছানা। গত বছর বাবার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই দ্বীপকে চলে আসতে হয় ঢাকায়। কাকাদের সহায়তায় সাবলেটের ব্যবস্থা হয়, কিন্তু সেই ছাগল দুটি কার গোয়ালে আশ্রয় পেল, তা আর জানা হলো না তার।
হাতের জয়েন্ট শেষ করে চোখ মেলে তাকায় দ্বীপ। সামনে মুখোমুখি বেঞ্চে একটি মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির শারীরিক গড়ন কমবয়সীদের মতো, কিন্তু মাথাভর্তি সাদা চুল। তাকে দেখে দ্বীপের মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়। স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় শৈশবের কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত—তীব্র তৃষ্ণায় কান্না, ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে পাখির দল দেখা, কিংবা পুকুরপাড়ে ভেসে যাওয়া এক ছোট বাচ্চা। এরপর মনে পড়ে যায় বাঁশঝাড়ের ওপারের পরিত্যক্ত ঘরগুলোর কথা, যেখানে শহুরে মানুষের সাথে আসা এক ছোট মেয়েকে দেখেছিল সে। সেই মেয়েটির মাথাতেও ছিল সাদা চুল। দ্বীপের মনে হয় মেয়েটির নাম হয়তো ক্ষণপ্রভা, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে ক্ষণপ্রভা তো তার দিদার নাম। সেই ছোট মেয়েটির নাম সে জানত না, আর সামনের এই মেয়েটি সেই মেয়ে কি না, তা নিয়েও সে নিশ্চিত নয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে কালবৈশাখী শুরু হয়। চারদিকে উড়তে থাকা ধুলো, প্লাস্টিকের ব্যাগ আর বোতলে ভরে যায় চারপাশ। এরপর শুরু হয় বৃষ্টি। শরীরে সুচের মতো বিঁধতে থাকা জলরাশির মাঝে দ্বীপ বুঝতে পারে, সে মেয়েটিকে আগলে রাখতে চায় এবং একবার জিজ্ঞাসা করতে চায় সেই হারিয়ে যাওয়া ছাগল দুটোর কথা। দ্বীপ হাত বাড়ালে মেয়েটি সাবলীলভাবে সেই হাত ধরে, যেন সে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষাতেই ছিল। এরপর দুজনে দৌড়ে খুঁজতে থাকে একটি নিরাপদ সূর্যাস্ত।