ইউরোপের কৌশলগত বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা, লোহিত সাগরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) তার বৈদেশিক অংশীদারত্ব আবারও মূল্যায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একই সময়ে ইইউর ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগ ও চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’–এর (বিআরআই) মধ্যে প্রতিযোগিতা, পাশাপাশি ইউরোপের বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রচেষ্টাও এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তকারী দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে আর কেবল বাণিজ্যিক সুবিধা, সুশাসন নিয়ে বিতর্ক এবং মানবাধিকার ইস্যুর প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার সুযোগ কম। বরং দুই পক্ষের সম্পর্ক যে ধাপে এগোচ্ছে, সেটির ধরন বোঝার চেষ্টা জরুরি।

সম্প্রতি পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার এবং ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি-বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজা কালাসের মধ্যে বৈঠক এবং ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত অষ্টম পাকিস্তান-ইইউ কৌশলগত সংলাপ—ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই পক্ষের সম্পর্ক একটি কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইউরোপ এখনো পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। দুই পক্ষের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি+)। ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাকিস্তানের রপ্তানিনির্ভর শিল্পকে শক্তিশালী করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতি অর্জনে উৎসাহ জুগিয়েছে।

ব্রাসেলস ও ইসলামাবাদ যদি এই অভিন্ন স্বার্থকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আস্থায় রূপ দিতে পারে, তাহলে সম্পর্কটি একটি সফল বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সেতুতে পরিণত হতে পারে।

তবে জিএসপি+ এখনো সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও তা পুরো সম্পর্কের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে না। ইউরোপ যখন সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনছে, গ্লোবাল গেটওয়ের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক, দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তার সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে, তখন পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত পাকিস্তান আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি করিডর, সামুদ্রিক নিরাপত্তার এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে।

ইউরোপের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতের সঙ্গে সম্প্রসারিত অংশীদারত্বও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ব্রাসেলস যদি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া নীতি অনুসরণ করতে চায়—যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করবে, কূটনৈতিক বিকল্প বাড়াবে এবং পুরো অঞ্চলকে একক কোনো কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রবণতা এড়াবে—তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক পাকিস্তান-ইইউ আলোচনায় এই বিস্তৃত এজেন্ডার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এখন দুই পক্ষের আলোচনা শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; জলবায়ু–সহনশীলতা, শিক্ষা, অভিবাসন, ডিজিটাল সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিও আলোচনার পরিধিতে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা—এসব বিষয় নিয়েও দুই পক্ষই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতিতে এখনো গণতন্ত্র, সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং পাকিস্তানও মোটের ওপর এসব নীতির সঙ্গে একমত। তবে দেশটির বক্তব্য হলো, তার গণতান্ত্রিক বিকাশকে সংবিধানের বিবর্তন, আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও কঠিন নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা উচিত।

গত দুই দশকে পাকিস্তানে সংবিধানসম্মত উপায়ে একাধিকবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে এবং অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। দেশটিতে সক্রিয় বিচার বিভাগ, প্রাণবন্ত গণমাধ্যম এবং ক্রমবর্ধমান নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণও রয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়নশীল গণতন্ত্রের মতো পাকিস্তান একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

এসব চ্যালেঞ্জ ইউরোপের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে; এতে দেশটিকে মানবিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হয়েছে।

আফগানিস্তানে তালেবালের ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তপারের জঙ্গিবাদ নিয়ে উদ্বেগ আবারও বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে চলমান অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়ছে অনিয়মিত অভিবাসন, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপর। এসব বিষয় ক্রমেই ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তা এজেন্ডাকেও প্রভাবিত করছে।

এ কারণে ইসলামাবাদের অবস্থান হলো, সুশাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় এসব নিরাপত্তা বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। অন্যদিকে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের অবস্থান হলো, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মৌলিক অধিকার অপরিহার্য।

এখানে মূল চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া নয়; বরং বুঝতে হবে, টেকসই নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। একইভাবে গণতন্ত্রের অগ্রগতির জন্যও প্রয়োজন স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিবেশ।

পাকিস্তান ও ইউরোপের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে কৌশলগত সম্পর্কের যুক্তি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, নিরাপদ সামুদ্রিক পথ এবং নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক অংশীদারের সন্ধানে থাকা ইউরোপের কাছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করতে সক্ষম দেশগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। তবু শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই কোনো দেশকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে না।

বর্তমানে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান ভূমিকার সমন্বয়। ইউরোপের নীতিনির্ধারণে যদি পাকিস্তানকে এখনো প্রধানত জিএসপি+-এর শর্ত পূরণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলে দেশটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে ভূমিকা রাখতে পারে, তা উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইউরোপ যখন দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার নতুন যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, তখন পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব কমার বদলে আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়।

পাকিস্তান-ইউরোপ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধার চেয়ে বরং দুই পক্ষ নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের ক্রমবর্ধমান অভিন্নতা কতটা উপলব্ধি করতে পারে—তার ওপর।

ব্রাসেলস ও ইসলামাবাদ যদি এই অভিন্ন স্বার্থকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আস্থায় রূপ দিতে পারে, তাহলে সম্পর্কটি একটি সফল বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সেতুতে পরিণত হতে পারে।

সাইমা আফজাল দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন ও ভূরাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করেন। জার্মানির জাস্টুস লিবিগ ইউনিভার্সিটিতে গবেষক হিসেবে কর্মরত।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত