বিশ্বকাপজয়ী দলের সাফল্যের কথা উঠলে সাধারণত কৌশল, ফরমেশন কিংবা তারকা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের আলোচনা হয়। তবে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কাছে এই জয়ের সূত্রটি ভিন্ন। তাঁর মতে, একটি দলের সাফল্যে শুধু দক্ষ ফুটবলার থাকলেই চলে না, বরং খেলোয়াড়দের ‘ভালো মানুষ’ হওয়াও সমান জরুরি।
বিশ্বকাপ জয়ের পর স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস-কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ তাঁর সাফল্যের দর্শন ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, বছরের পর বছর একই ফুটবল-দর্শনের প্রতি অবিচল থাকা, সঠিক খেলোয়াড় নির্বাচন এবং ড্রেসিংরুমের ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখাই স্পেনকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছে।
ভালো মানসিকতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ফুয়েন্তে বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে একসঙ্গে ৫২ দিন কাটিয়েছি, অলিম্পিকে ৪৫ দিন এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের সঙ্গে ৪৩ দিন থেকেছি। ভালো মানসিকতার মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এতে দল পরিচালনা করাটা অনেক সহজ হয়।’
স্পেনের দীর্ঘ বিশ্বকাপ ক্যাম্পে কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল না বলে জানান কোচ। এমনকি যারা খেলার সুযোগ পাননি, তাদের মধ্যেও কোনো অসন্তোষ ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বয়সভিত্তিক ফুটবলে বহু বছর কাজ করার কারণে তাদের বেশির ভাগ খেলোয়াড়কেই আমরা খুব ভালোভাবে চিনি। তারা আমাদের কাঁচামাল। আমরা জানি কারা মানসিকভাবে শক্ত, বা ক্যাম্পের ৫২ দিন এক মিনিটও খেলার সুযোগ না পেলেও কারা মুখ গোমড়া করে বসে থাকবে না।’
২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সঙ্গে বর্তমান দলের মিল এবং ‘টিকিটাকা’ ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফুয়েন্তে জানান, মূল মডেলটি একই থাকলেও তিনি প্রচলিত শব্দতত্ত্বের চেয়ে ভিন্ন শব্দ পছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘টিকিটাকার মতো বহুল প্রচলিত শব্দের আমার পছন্দ নয়। এটাকে আমার ‘কম্বিনেশন ফুটবল’ বলতে ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে ‘টিকিটাকা’ শব্দটিকে কিছুটা নেতিবাচকভাবেও ব্যবহার করা হতো। তা সত্ত্বেও এই ফুটবল দর্শন স্প্যানিশ ফুটবলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে, যার সূচনা হয় ক্লাব পর্যায়ে। জাতীয় দল কেবল এটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে।’
আধুনিক ফুটবলে কেবল বল দখলে রাখলেই জয় নিশ্চিত হয় না বলে মনে করেন ফুয়েন্তে। তাঁর মতে, কোনো দল মাত্র ৩০ শতাংশ বল দখল করেও ৩-১ ব্যবধানে জিততে পারে। স্পেনের বর্তমান ফুটবল মডেলটি বোঝার আগ্রহ দেখিয়েছে ইউরোপের অন্যান্য পরাশক্তিগুলো। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি—সবাই এসেছে। একটা সময় ইতালি খুব ঘনঘন আসত। জার্মানিরও একটা সময় আমাদের মতো খুব শক্তিশালী ভিত্তি ছিল। তবে এটি খুব সহজ নয়, বেশ জটিল। প্রথমত, এর জন্য বছরের পর বছর কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, এটি ক্লাবগুলোর ওপর ভীষণভাবে নির্ভর করে। কারণ, ক্লাবের কোচেরাই তরুণদের গড়ে তোলেন। একদম ছোটবেলা থেকে পাওয়া এই শিক্ষার কারণেই ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা বিশ্বের সেরা।’
উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপজয়ী স্পেন ফুটবল দলকে দেশটির সরকার বড় সম্মাননা প্রদান করেছে।