সময়ের আগেই বঙ্গভবন ছাড়তে যাচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব থেকে তাঁর এই বিদায় অনেকটাই রংহীন। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাষ্ট্রপতি। স্বাধীন বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সাহাবুদ্দিনসহ ১৭ জন রাষ্ট্রপতি দেখেছে। এর মধ্যে দুজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন অথবা অস্থায়ী ছিলেন। তবে অধিকাংশ রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির বিদায়ের জন্য সংবিধান বা আইনে কোনো বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় আচার বা অনুষ্ঠানের বিধান নেই। তবে ২০২৩ সালে মো. আবদুল হামিদকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়। সে সময় বঙ্গভবন থেকে জানানো হয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে এই ধরনের বিদায় অনুষ্ঠান এটাই প্রথম।

তৎকালীন বিদায় অনুষ্ঠানে আবদুল হামিদকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। লালগালিচা সংবর্ধনার পাশাপাশি পুষ্পশোভিত খোলা জিপে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে বিদায় জানানো হয়। খোলা জিপটি বঙ্গভবনের মূল ফটকে পৌঁছালে আবদুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী বিশেষ নিরাপত্তা দলের তত্ত্বাবধানে অন্য গাড়িতে করে নিকুঞ্জের নিজ বাড়িতে যান।

বাংলাদেশে যে কজন রাষ্ট্রপতি স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন সংবর্ধনার প্রচলন ছিল না। এর একটি কারণ হতে পারে, রাষ্ট্রপতি পদে তাঁরা নিজ দলের শাসনামলে নির্বাচিত হলেও বিদায় হয়েছে প্রতিপক্ষ দলের শাসনামলে। ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে প্রতিবারই বিরোধী দল সরকার গঠন করেছে। ফলে প্রতিপক্ষ দলের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বিদায় স্মরণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকে। এই আমলের প্রতিটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তিনজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে পরপর দুইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধানে দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ নেই।

২০২৩ সালে আকস্মিকভাবে রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর সময়কালেই ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী দলগুলোর অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়, যা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই বছর ৫ আগস্ট ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে এবং তিনি ভারতে পালিয়ে গেলে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর তাঁর পদ ছাড়ার ক্ষণগণনা শুরু হয়, যা গত শুক্রবার বাস্তবায়িত হয়।

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তাঁর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শুরু করেন। ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান তৎকালীন স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ, যিনি ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর পরদিন থেকে পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই বছরের ১৫ আগস্ট একদল সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। তবে ক্যু ও পাল্টা ক্যু-র মধ্য দিয়ে তিন মাসের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের হাতে। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েমের পদত্যাগের পর তিনি রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৭৮ সালের জুনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন তিনি। এরপর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী ও পরবর্তীতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন।

এরই মাঝে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। টানা ৯ বছর শাসনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন এরশাদ।

১৯৯১ সালে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতি চালু হলে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটা আলংকারিক হয়ে পড়ে। বিএনপি নেতা আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হয়ে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করলেও কোনো বিদায় সংবর্ধনা পাননি, কারণ ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর তাঁর সঙ্গে সরকারের তিক্ততা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের সময় তিনি ‘যথাযথ’ ভূমিকা রাখেননি। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের বিদায় হয় নীরবে-নিভৃতে। উল্লেখ্য, এরশাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর অনুরোধে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছিলেন।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দলীয় নেতা এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলেও মাত্র সাত মাস সাত দিন পর দলীয় মতবিরোধের কারণে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর তৎকালীন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচন নিয়ে সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে এবং এক-এগারোর পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে ইয়াজউদ্দিনই থেকে যান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন।