২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বিকেলে বেগার্ট ইনস্টিটিউটে ইমতিয়াজ আলম বেগের সঙ্গে আড্ডার এক ফাঁকে সামনে আসে একটি কালো মলাটের দুষ্প্রাপ্য বই। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) থেকে প্রকাশিত বইটির নাম ‘ফটোগ্রাফি ডাইজেস্ট’, যার রচয়িতা মনজুর আলম বেগ। বইটির প্রচ্ছদে গ্রন্থরচয়িতার তোলা একটি সাদাকালো ছবি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছবির পটভূমিতে নগরের পিচঢালা রাস্তায় সিমেন্টের তৈরি কিছু মোটা পাইপ, যার ভেতর তপ্ত দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন দুই শ্রমজীবী মানুষ। পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলে যাচ্ছে একটি নির্মাণসামগ্রীর ট্রাক। নাগরিক জীবনের এই সাধারণ দৃশ্যটি যেন জড়বস্তুর মাঝে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছে। পাইপগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা আলো ও ছায়ার বক্রাকার রেখাগুলো অনেকটা গোলাপের পাপড়ির চক্রাকার বিন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এক অনবদ্য উপস্থাপনা এই ছবিটি। যদিও ছবিটির সঠিক সময় ও স্থান উল্লেখ নেই, তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ধারণা করা যায় এটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ঢাকায় তোলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানীর ফাঁকা রাস্তা, পয়োনিষ্কাশন পাইপ এবং দূরে দৃশ্যমান ঊর্ধ্বমুখী দালানকোঠা যেন একটি নতুন রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক। এই ছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ "পাঁচ দশক আগে এই শহর কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের অনেক জবাব আছে এই ছবিতে। ফলে মনজুর আলম বেগের এই ছবির এক ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।"

মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরায় তোলা এই ছবি সম্পর্কে প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘কী অসাধারণ একটি ছবি ও তার শিল্পরূপ। পয়োনিষ্কাশন পাইপগুলো রাস্তার ধারে সাজানো। কিন্তু সেসব চোঙার মতো নলের বৃত্তাকার মুখগুলো সৃষ্টি করেছে এমন এক আর্ট, যাকে তুলনা করে চলে আধফোটা গোলাপের মুখের সঙ্গে। গোলাপের পাপড়িগুলো যে রকম সর্পিলাকারে সজ্জিত থাকে, মাঝে থাকে একটা ঘন কেন্দ্র, পাইপের মুখগুলোও যেন সে রকম। আর তা দেখার চোখ না থাকলে আলোকচিত্রশিল্পী নিশ্চয়ই সেটিকে ছবি করে তুলতে পারতেন না। সাধারণ বিষয়ের ছবিই তাই ক্যামেরার ফ্রেমে অসাধারণ হয়ে উঠেছে—এখানেই শিল্পীর মাহাত্ম্য।’

ছবিটির একাডেমিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’র প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ সাইফুল অমি বলেন, ‘স্ট্রিট ফটোগ্রাফির প্রধান বৈশিষ্ট্য মূলত দুটো। কম্পোজিশনের চমক আর আলোকচিত্রীর মুহূর্ত ধরতে পারার ক্ষমতা। জগদ্বিখ্যাত প্রায় সব আলোকচিত্রীর কাজে এই বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রবণতার একটা স্বাভাবিক বিপদ হচ্ছে বেশির ভাগ সময়ই ছবি হয়ে ওঠে আলোকচিত্রীর নিজস্ব ক্ষমতা আর প্রতিভার গুণে। মানুষ সেখানে গৌণ। আলোকচিত্রের সব ধারার মধ্যে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি তাই সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বেগ স্যারের এই বিশেষ ছবি প্রথম দেখলাম। আর বরাবরের মতোই থমকে গেলাম। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির সব প্রথা ভাঙা এক ছবি—যার একটার পর একটা তলা। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ, অন্তহীন যাতনার অতল জীবন—যার চক্কর থেকে বের হয়ে আসার ক্ষমতা তার নাই। আলোর খেলা, বাঁয়ে চলমান গাড়ি, যা জীবনেরই সিম্বল। দম বন্ধকরা পাইপের ভেতর আটকে যাওয়া জীবন—আর কে এমন করে বলতে পারে গল্প; দারিদ্র্যের, বেঁচে থাকার—এইখানেই বেগ স্যার সবার থেকে আলাদা। আলোকচিত্রী নিজে এইখানে বড়, নাকি যার গল্প বলা হচ্ছে সে।’

সাইফুল হক অমি আক্ষেপের সাথে আরও উল্লেখ করেন, ‘আলোকচিত্রের একজন শিক্ষক হিসেবে একটা প্রশ্ন আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। আমরা আমাদের আলোকচিত্রের প্রধান মানুষ বেগ স্যারের আরও অনেক বেশি কাজ যদি জনসমক্ষে নিয়ে আসতে পারতাম, বাংলাদেশের আলোকচিত্রের গতিপথ তাহলে কেমন হতো? মনে পড়ে তার এক প্রদর্শনীর কথা। কয়েক বছর আগে ঢাকার ধানমন্ডিতে ‘উত্তরসূরি’ আয়োজিত ওই প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ভেবেছি আমাদের সব থেকে ক্ষমতাবান আলোকচিত্রীর কতটুকু আমরা সামনে আনতে পারলাম!’

বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মনজুর আলম বেগ। এ দেশের আলোকচিত্রশিল্পে তাঁর অবস্থান চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের সমতুল্য। শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে তিনি আলোকচিত্রের বিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন এবং ছবি তোলার প্রথাগত ধারণা বদলে দিয়েছেন। তিনি জীবনভর ছবি তুলেছেন, লিখেছেন এবং নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করেছেন। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, "তিনি জীবনভর ছবি তুলেছেন, লিখেছেন, অন্যকে লিখতে উৎসাহিত করেছেন; একটি শিল্পপ্রজন্ম গড়ে তুলতে তিনি কী না করেছেন! অথচ এমন এক নক্ষত্রমানবের বেশির ভাগ ছবি যে প্রজন্মের অদেখা রয়ে গেল—সেটি বরং আলোকচিত্রশিল্প মাধ্যমের জন্য এক বড় দুর্ভাগ্য।"