বরিশাল সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ‘ব্যবসায় উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের তালিকায় প্রদর্শিত নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। অভিযোগ উঠেছে, ভুয়া তথ্য দিয়ে এবং তালিকাভুক্তদের স্বাক্ষর জাল করে পুরো প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে পাওয়া ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের ছাগল উৎপাদন ও গরু মোটাতাজাকরণ দলের একাধিক প্রশিক্ষণ তালিকার তথ্যানুসারে অনুসন্ধানে নামলে এসব অসংগতি উঠে আসে।
এ বিষয়ে জানতে বরিশাল সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে গেলে কথা হয় উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার জুঁই দত্তের সঙ্গে। এসময় তার কাছে ব্যবসায় উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের উপকারভোগিদের তালিকা চাওয়া হয়। তালিকা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন কাজ করতে এসে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি।
উপজেলা প্রাণী সম্পদের অফিসার জুঁই দত্তের দাবি, চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হয় ব্যবসায় উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের প্রজেক্ট। শেষ মুহূর্তে তিনি প্রজেক্ট ক্লোজ করতে যখন অডিট হয় তখন উপকার ভোগিদের নামের সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানার যেমন গরমিল পেয়েছেন। তেমনি অনেক ঠিকানায় গিয়ে উপকার ভোগিদের খুঁজে পাননি। ফলে প্রজেক্ট ক্লোজ করতে ও অডিট সম্পন্ন করতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাকে। এমনকি পড়তে হয়েছে নানা ভোগান্তিতে।
তিনি আরও বলেন, একজন কর্মকর্তা কাজ করে গেলে আরেকজন কর্মকর্তার সেই কাজ বুঝে নিতে বা শেষ করতে কিছুটা সমস্যা হয়। কিন্তু এই প্রজেক্টে সমস্যার শেষ ছিল না। পুরোটাই ভোগান্তিতে ভরা ছিলো বলে দাবি তার।
এদিকে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের ব্যবসায় উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় একাধিক ছাগল উৎপাদনকারী দলের প্রশিক্ষণের উপকার ভোগির তালিকা পাওয়া যায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে। এ সময় প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলেন ডা. প্রদীপ কুমার বিশ্বাস। ডা. প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।
তালিকার বেশ কিছু নাম্বারে ফোন দিলে বেশিরভাগ নাম্বারই বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া ২০২৩ সালের ৫ আগস্টে বরিশালের সদর উপজেলার কড়াপুর এলাকায় ছাগল উৎপাদনকারী দলের প্রশিক্ষণের তালিকায় নাম থাকা নিলুফার মোবাইল নাম্বারে ফোন দিলে সেটা রিসিভ করেন আরেক নারী। তিনি জানান, এখানে নিলুফা নামে কেউ থাকে না এমনকি এই নাম্বার নিলুফার নয়।
এরপর তালিকায় থাকা সাজেদা বেগমের সঙ্গে কথা বলতে ফোন দিলে তা রিসিভ করেন মাসুমা বেগম। তিনি জানান, কোনো ধরনের ছাগল উৎপাদনকারী দলের প্রশিক্ষণের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। এমনকি তার বাসা কড়াপুর নয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে।
এরপর তালিকায় থাকা মিসেস লিপি আরার সঙ্গে কথা বলতে ফোন দিলে ফোনটি রিসিভ করেন শারমিন। তিনি জানান, কড়াপুর নয় তার বাড়ি পশ্চিম চড়াদী। কোনো ধরনের ছাগল উৎপাদনকারী দলের প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত নন তিনি। এমনকি কোনো ধরনের টাকাও পাননি।
শুধু এই একটি তালিকাই নয় ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল আস্তাকাঠি এলাকায় অনুষ্ঠিত ছাগল উৎপাদনকারী দলের প্রশিক্ষণ ও ২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল দক্ষিণ চর আইচা নূতন গরু মোটাতাজাকরণ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি দলের প্রশিক্ষণে নামের সঙ্গে ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরের অমিল খুঁজে পাওয়া গেছে। যাদের মোবাইল নম্বর আছে তারা কোনোদিন কোনো প্রশিক্ষণ বা প্রাণী সম্পদ দিয়ে টাকা পায়নি বলেও জানান।
এদিকে এ সময় প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। উল্টো দুই বার ফোন কেটে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তালিকা দেখে তিনি সন্দেহ করেন— তালিকায় থাকা প্রত্যেকের স্বাক্ষর একই হাতের লেখা। মুক্তকণ্ঠকে তিনি জানান, বিষয়টি আসলেই দুঃখজনক। তদন্ত করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।