রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে বোমার উৎস, কারা এটি সেখানে স্থাপন করেছে এবং এর পেছনে কোনো উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেরানীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লার সাম্প্রতিক বিস্ফোরণগুলোর সঙ্গে এই ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র যাচাই করা হচ্ছে।
গত শুক্রবার রাতে মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলাটি করেন। মামলায় বেআইনিভাবে বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বহন বা ব্যবহার এবং অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাটি মতিঝিল থানা-পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত করছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বোমা রাখার ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। বোমার উৎস এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।"
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, মতিঝিলে মেট্রোস্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের কাছে একটি ছাতার ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পান কর্তব্যরত পুলিশ। পরবর্তীতে পুলিশের বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ দল সেটি নিষ্ক্রিয় করে। এই প্রক্রিয়ায় চোখে স্প্লিন্টার লেগে আহত হন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মিরাজ হোসেন। উদ্ধার করা বোমাটি ছিল একটি আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, শুক্রবার বেলা একটায় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর প্রদক্ষিণ করে স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে শেষ হওয়া একটি উল্টো রথযাত্রা ছিল। ওই এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট কাওছার হোসেন সন্ধ্যা ছয়টায় ডিএমপি কন্ট্রোল রুমকে জানান যে, মেট্রোস্টেশনের নিচে একটি ছাতা পাওয়া গেছে এবং তার ভেতরে আলো জ্বলছে। এরপর দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে।
পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার হোসেন মোহাম্মদ ফারাবী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কারা কীভাবে, কখন বোমাটি রেখেছে, তা ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়নি। তবে ওই এলাকার কিছু সিসি ক্যামেরা নষ্ট। ধারণা করা হচ্ছে, উল্টো রথযাত্রা মেট্রোস্টেশন অতিক্রম করার সময় বোমাটি রাখা হয়েছে। রথযাত্রায় নাশকতার উদ্দেশ্যে এটি রাখা হয়েছিল।"
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই ঘটনার পেছনে কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার নামে ভাড়া নেওয়া একটি বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেখান থেকে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিডসহ প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক এবং নয়টি তাজা বোমা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় নব্য জেএমবি সদস্য শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, বোমা তৈরির সময় অসতর্কতার কারণে বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে আল আমিন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান আহত হন।
কেরানীগঞ্জের ওই বিস্ফোরণের পর গত মার্চ পর্যন্ত যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালি, সায়েদাবাদের জনপদ মোড় এবং কুমিল্লা শহরের একটি শিবমন্দিরে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের সঙ্গে একই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ শেখ আল আমিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফকে শনাক্ত করেছে এবং তিনটি ঘটনাতেই তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
ডিএমপির সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জের বোমাটি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে তৈরি ছিল, অন্যদিকে মতিঝিল থেকে উদ্ধার করা বোমাটি জাআই পাইপের ভেতরে সার্কিট ও ব্যাটারি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। এখন পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে, আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই সর্বশেষ বোমা উদ্ধারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না।